’১৮ সালের ডিসেম্বরের আগেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে

প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু নির্মাণে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। জানুয়ারি পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ২৯ শতাংশ। মূল সেতুর এ্যালাইনমেন্ট বরাবর ১৫০ মিটার প্রশস্ত চ্যানেল তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। এ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা সহায়তার জন্য নিযুক্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চলতি সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করবে। বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ পরিদর্শনের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন সুপারিশ ও জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে এসব তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

গত রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয় সেতু নির্মাণে সার্বিক কার্যক্রমের সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটি সূত্রে জানা গেছে, কমিটির সভাপতি একাব্বর হোসেনের নেতৃত্বে কমিটির অপর সদস্যরা সেতুর নির্মাণ কাজ পরিদর্শনে গিয়ে কাজের গতি, মান ও মাল সংগ্রহের অবস্থা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রকল্পে নিয়োজিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করেন। বর্তমান কাজের গতি বজায় থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে মন্তব্য করে কমিটি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দ্রুত সংগ্রহ করে মূল সেতুর কাজ শুরু করা প্রয়োজন। তা না হলে সমালোচকরা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতে থাকবে।

এদিকে সংসদীয় কমিটিকে দেয়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অনুকূলে সেতু বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বিভাগ অর্থ দিচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী ছাড় করা হচ্ছে। মোট ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পের ২য় সংশোধিত ডিপিপি গত ৫ জানুয়ারি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৬৮ কোটি ১১ লাখ টাকা অর্থাৎ ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল সেতুর মোবিলাইজেশন কাজে ১৯ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এ কাজের চুক্তি মূল্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৭২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। মূল সেতুর পিয়ার-৭ এ ২টি পাইল এবং পিয়ার-৬ এ ১টি পাইলের বটম বা তলদেশ ৭০ মিটার সেকশন ড্রাইভ শেষ হয়েছে। আরও ২টি পাইলের বটম সেকশন ড্রাইভ করার প্রস্ততি চলছে। ট্রায়াল পাইপের ভেতরের বালি অপসারণ করা হয়েছে এবং বটম প্লাগ করার প্রস্ততি চলছে। মূল সেতুর ২৮ হাজার ৮শ’ মিটারের মধ্যে ৫ হাজার মিটার স্টীল পাইল ফেব্রিকেশন কাজ শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে মূল সেতুর ১০টি টেস্ট পাইলের মধ্যে ৪টি টেস্ট পাইল ড্রাইভ, ভায়াডাক্টের ১৬টি টেস্ট পাইলের মধ্যে ৭টি টেস্ট পাইল ড্রাইভ শেষ হয়েছে এবং ২টির কাজ চলছে। পাইল নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য মোট ১ লাখ ২৯ হাজার টন স্টীল প্লেটের মধ্যে ৩৯ হাজার ৩শ’ টন স্টীল প্লেট ইতোমধ্যে সাইটে পৌঁছেছে। মূল সেতুর এ্যালাইনমেন্ট বরাবর ১৫০ মিটার প্রশস্ত চ্যানেল তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।

প্রতিবেদনে নদী শাসন কাজের ভৌত অগ্রগতি ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। এ কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এর মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। নদী শাসন কাজের জন্য বিভিন্ন আকারের বোল্ডার, স্টোনচিপস, সিলেট বালি, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী সাইটে মোবিলাইজেশন প্রক্রিয়াধীন আছে। জিও ব্যাগে বালি ভরার জন্য মেশিন স্থাপন, কংক্রিট ব্লক উৎপাদনের জন্য মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। কংক্রিট ব্লক কাস্টিংয়ের কাজ ও জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান আছে। মোট ১ কোটি ৩৩ লাখ ১ হাজার ২৪৮ কংক্রিট ব্লকের মধ্যে ১৯ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪ কংক্রিট ব্লক কাস্টিং শেষ হয়েছে। মোট ২ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার জিও ব্যাগের মধ্যে ৬ লাখ জিও ব্যাগ ডাম্পিং শেষ হয়েছে। বর্তমানে জাজিরা প্রান্তে ড্রেজিং চলছে।

প্রতিবেদনে সার্ভিস এরিয়া-২, সংযোগ সড়ক ও ভূমি অধিগ্রহণের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭১ শতাংশ। এ কাজের চুক্তিমূল্য ২০৮ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৪৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। জাজিরা সংযোগ সড়কের কাজের ভৌত অগ্রগতি ৫৬ শতাংশ। এ কাজের চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৯৭ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৮২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। মাওয়া সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৪ শতাংশ। এ কাজে চুক্তিমূল্য ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ১৪৩ কোটি ২ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের জন্য মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলছে।

এছাড়া পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে পুনর্বাসন ও সার্ভিস এরিয়া এলাকায় বনায়নের জন্য জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭০ হাজার ৪৫২টি গাছ লাগানো হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় একটি জাদুঘর স্থাপনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হাই পয়েন্ট রেন্ডেল (এইচপিআর) ইউকে এ্যান্ড এ্যাসোসিয়েটস চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে কার্যক্রম শুরু করবে।