গণতন্ত্র হোক উন্নয়নবান্ধব

উন্নয়ন আগে, না গণতন্ত্র আগে? টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য কিনা এ বিতর্ক অনেক পুরনো। তবে কম রাজনীতি উন্নয়নের সহায়ক এটা আমাদের ইদানীংকালের বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দিয়েই দেখেছি। এর আগে, ‘কম রাজনীতি’ শব্দ যুগলকে ‘কম গণতন্ত্র’ বলে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের মতো নির্মাণাধীন গণতন্ত্রের দেশে গণতন্ত্রের মাপকাঠি দুটি— একটি ‘রাজপথের কর্মসূচি’ অপরটি ‘নির্বাচন’। রাজপথের অহিংসাত্মক কর্মসূচি যেমন একটি মহাসমাবেশ বা বড় র‌্যালি কিভাবে দেশের অর্থনীতিকে এক-দুই দিনের জন্য থমকে দেয় সে অভিজ্ঞতা কম বেশি সবারই আছে। গুলিস্তান বা পল্টনের একটি জনসভা পুরো রাজধানীর অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে একদিন পিছিয়ে দেয়। অবরোধ বা হরতাল কি ভয়ঙ্কর ক্ষতি করতে পারে তা আমরা ২০১৫ সালের প্রথম নব্বই দিন দেখেছি। বাকি থাকল নির্বাচন। প্রত্যেকটি জাতীয় নির্বাচন কিভাবে কার অধীনে হবে এ নিয়ে আমাদের রাজনীতিতে যে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তা থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ, হরতাল বা যানজট সৃষ্টিকারী কর্মসূচি আর নির্বাচন কীভাবে হবে এই মীমাংসিত বিতর্ক বাদ দিয়ে উন্নত গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারছি না। রাজনীতির উপরোক্ত অংশটুকু বাদ দিলে যা থাকে তাকেই আমি ‘কম রাজনীতি’ বলছি। যা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় আছে। যে দুটি দেশের কথা আমরা এশিয়ায় উন্নয়নের মডেল হিসেবে উল্লেখ করে প্রায়ই আমরা এ দুটি দেশকে বেঞ্চমার্কিং করি, অর্থাৎ ওদের মতো হতে চাই। মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত শাসনকে কেউ কেউ কর্তৃত্ববাদী শাসন বললেও এ সময়ে দেশটি দৃষ্টান্তমূলক উন্নতি করেছে। ২০১৪ সালে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২৪,৬৫৪.১৯ ডলার। একই শাসনের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রবাদীদের অন্যতম দোসর দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘ ৩০ বছর যাবৎ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনেই আছে। ১৯৬০ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ১১০৬.৭৫ ডলার সেখানে ২০১৪ সালে তা দাঁড়ায় ৩৫,২৭৭.৩৫ ডলার। ইদানীংকালে দেশটি পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম পশোভোরস্কি তার ‘ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট : পলিটিক্যাল ইন্সটিটিউশনস অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ১৯৫০-১৯৯০’ পুস্তকে দেখিয়েছেন ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে মানুষের আর একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় (৬০৫৫ ডলার) পৌঁছানোর পর গণতান্ত্রিক শাসনের আর কখনো পতন হয় না।’ হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ ল্যারি সার্মাসের মতে, ‘শুধু গণতন্ত্রেই অর্থনৈতিক প্রগতি সম্ভব এমন ধারণা ভেঙে দিয়েছে চীন।। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধির হার যখন সবচেয়ে বেশি ছিল তখন সেখানে জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হতে সময় লেগেছে গড়ে ৩০ বছর কিন্তু চীনে জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে প্রায় প্রতি দশকে। দীর্ঘ সামরিক বা প্রায় সামরিক শাসনের পর নব্বই দশকে আমরা গণতন্ত্র তথা কেবল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পাই। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভোটের অধিকার ফিরে পেলেও সেনানিবাস থেকে গণতন্ত্র পুরো মুক্ত হতে পারেনি। ২০০৯ সালের পরই গণতন্ত্রকে সেনানিবাস থেকে বের করে আনা সম্ভব হয় এর সবটুকু কৃতিত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এটা করেছেন তিনি খালেদা জিয়া ও এরশাদকে সেনানিবাস থেকে বের করে দিয়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি ত্রুটিযুক্ত এবং এতে সব দলের অংশগ্রহণ ছিল না। এমনকি অনেক সমালোচনায় শেখ হাসিনার শাসনকে কম গণতন্ত্রী বা কর্তৃত্ববাদী শাসন বললেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে ২০০৬-০৭ পর্যন্ত ৩৪ বছর সময় লেগেছিল আমাদের মাথাপিছু আয় ৫২৩ ডলারে আসতে। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৪-১৫-তে এটা দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ ডলার। ২০০৭-০৮ সালে আমাদের রপ্তানি ১৪.১১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৩১.২০ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৫তম, আর ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে আমাদের অবস্থান ৩৩তম। এসময়ে দারিদ্র্যের হার ৪১.৫% থেকে কমে ২২.৪% এসেছে। ২০০৬ সালে বিদেশ থেকে রেমিটেন্স বাবদ আয় ছিল ৪.৮০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-২০১৬ তে দাঁড়িয়েছে ১৫.২ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ২ কোটি ৭৮ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৪-১৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী আমাদের জিডিপির বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থেকে ২০১৮ সালে তা বর্তমান ৬.৫% থেকে ৭% এ উন্নীত হবে। ‘উইন অ্যান্ড গ্যালপ ইন্টারন্যাশনাল’ বিশ্বে আশাবাদী দেশের তালিকার শীর্ষে রেখেছে বাংলাদেশকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৭৪। ৭০ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন। আশাবাদী দেশের তালিকায় ৪৭ এবং ৪২ স্কোর নিয়ে নবম ও দশম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত। গণতন্ত্র সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি হয়তো আমাদের আছে কিন্তু কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো বাধা নেই। কথা বলা আমাদের অন্যতম বিনোদনও বটে। টকশো আমাদের টেলিভিশনগুলোর সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। টকশোয় আলোচনা হয় না এমন বিষয় আর অবশিষ্ট নেই। সবাই কথা বলছে। মেট্রোরেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে এমন লোককেও কথা বলতে দেখেছি যিনি বরিশাল থেকে লঞ্চে ঢাকা এসে দুনিয়ার আর কোথাও যাননি।

মেট্রোরেল কি তার কোনো ধারণাই নেই। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রণব কুমার বর্ধন তার ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে কমপ্লেক্স রিলেশনশিপ পুস্তকে যেমনটি লিখেছেন, ‘উন্নয়নের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের তরিকা সব সময় ভালো নয়। গণতন্ত্রে জনগণের যে দাবি-দাওয়াগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হয় তা সবক্ষেত্রে উন্নয়ন সহায়ক নয়। গণতন্ত্র অনেক সময় জনপ্রিয় দাবির প্রতি সংবেদনশীল বা কখনো কখনো এমন সুনির্দিষ্ট দাবির প্রতি গণতন্ত্রকে মাথা নোয়াতে হয় যা আসলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বা বড় আকারের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলোতেই আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কম বিশ্ববিদ্যালয়ই দেখেছি যার পাশে বা ভিতরে মেট্রো স্টেশন নেই। ঢাকার বাইরে বিদেশ দেখেনি এমন কিছু লোকের কথাকে গুরুত্ব দিলে আমাদের বহু প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল আরও পিছিয়ে যাবে। তবে মুক্ত আলোচনা ও তর্ক-বির্তকের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। যুক্তি রেখে আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে যে রাজনীতি তা কোনো সমাজে কাম্য হতে পারে না। উন্নয়ন নিয়েও যুক্তিতর্ক বিতর্ক হতে পারে। তবে কোনো জাতি উপসংহারে না এসে কেবল বিতর্ক করে যাবে তা কিন্তু ভল্টেয়ারও বলেননি। তিনি বলেছিলেন তোমার কথায় আমি একমত হতে না পারি কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকারের জন্য আমি জীবন দিতে পারি। অমর্ত্য সেনের ‘দি আরগুমেনটিভ ইন্ডিয়ান্স’ পুস্তকের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এ লেখার উপসংহার টানব। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘উন্নয়ন মানে মুক্তি। সে অনুযায়ী গণতন্ত্র মানেই উন্নয়ন। উন্নয়ন বিষয়টির সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা ও সুরক্ষামূলক নিশ্চয়তার বিষয়গুলো যুক্ত। আমাদের উন্নয়ন আমাদের গণতন্ত্র আমাদের মতো করেই সাজাতে হবে। বিদেশিদের পরামর্শে নয়। এক সময় বিদেশিরা গণতন্ত্র প্রসারের জন্য আর্থিক সাহায্য দিত। এখন শুধু পরামর্শই দেয়। নব্বই দশকে টঝঅওউ চালু করা হয় গণতন্ত্র প্রসারের লক্ষ্যে তাতে ২০০৯ সালে থেকে বরাদ্দ কমেছে ৩৮%। ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বাদ দিলে গণতন্ত্র মানব অধিকার ও সুশাসনের খাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাহায্যের পরিমাণ ২০১৪ সালে ছিল মাত্র ৮৬ কোটি ডলার, যা জর্জ সরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের এই খাতে বরাদ্দের চেয়েও কম। বিদেশিদের পরামর্শ শুনলে কি হতে পারে তা তুলে ধরার জন্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আর্চ বিশপ টুটো বলেছিলেন, ‘ইউরোপীয়রা যখন আমাদের দেশে এসেছিল তখন তাদের ছিল বাইবেল আর আমাদের ছিল জমি। তারা আমাদের চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের ধ্যান করতে বলল, আমরা তাই করলাম। চোখ খুলে দেখি আমাদের হাতে বাইবেল আর জমি চলে গেছে তাদের দখলে।’