মাঠে নেমেছে পুলিশের নতুন দুই ইউনিট

জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি-অর্থায়নসহ আন্তর্দেশীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশে মাঠে নেমেছে পুলিশের নতুন দুটি ইউনিট। বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে কাজ করছে স্পেশাল টাস্ক গ্রুপ (এসটিজি); সমন্বয় করা হচ্ছে সদর দপ্তর থেকে। আর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটি) কাজ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শাখা হিসেবে। জঙ্গিবাদ, চোরাচালান ও মানবপাচার প্রভৃতি আন্তর্দেশীয় অপরাধ দমনের কাজ করছে তারা। জঙ্গিদের হাতে খুন, বোমা হামলা, নাশকতার পরিকল্পনা প্রভৃতি বিষয়ের মামলাও তদন্ত করছে তারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিটি ইউনিটের কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠিয়ে সন্ত্রাস ও আন্তর্দেশীয় অপরাধের ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদেশি পুলিশ বা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কাজ করবে এ ইউনিট। আর জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি এবং জঙ্গিবাদী ঘটনার তদন্ত করছে এসটিজি। ইতিমধ্যে তিন হাজার জঙ্গির ডাটাবেইস তৈরি করেছে তারা। এসটিজিও বিদেশি সংস্থার সঙ্গে তথ্য সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, যেসব দেশে জঙ্গিবাদ ও মানবপাচার সমস্যা প্রকট সেখানে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট বা গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ‘পুলিশ ব্যুরো অব কাউন্টার টেররিজম (পিবিসিটি)’ গঠনের জন্য ছয় বছর আগে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনেও সেটি অনুমোদিত হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ নিজের দক্ষ সদস্যদের নিয়ে জঙ্গিবাদ ও আন্তর্দেশীয় অপরাধ দমনের জন্য আলাদা শাখা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৮ আগস্ট পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক এসটিজি গঠনের উদ্যোগ নেন। ১০ অক্টোবর এক হাজারের বেশি চৌকষ পুলিশ সদস্যকে নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। জেলা পর্যায়ে এসটিজির প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। মহানগর ও বিভাগীয় শহরে এসটিজির প্রধানের দায়িত্বে আছেন পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। পুলিশের অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এসটিজি জঙ্গিবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ এবং মামলার তদন্ত করছে। গত বছরের শেষ দিকে ডিএমপিতে সিটি ইউনিট গঠন করার প্রস্তাব করা হয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে এ ইউনিট। সম্প্রতি উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডিএমপিতে অতিরিক্ত কমিশনার) মনিরুল ইসলামকে এর প্রধান করা হয়েছে। মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন, সন্ত্রাসবাদ-সহায়ক অপরাধ, মানবপাচারসহ আন্তর্দেশীয় অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণই তাঁদের মূল কাজ। এই ইউনিটে ছয় শ লোকবল থাকবে; তিন শ লোকবল নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে। অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁরা আগে দায়ের হওয়া জঙ্গিবিষয়ক মামলার তদন্ত করবেন। এ বিষয়ক নতুন মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে সিটিকে।’ অতিরিক্ত কমিশনার আরো জানান, সিটির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ, ক্রাইমসিন ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এবং ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ রয়েছে। বিভাগের দায়িত্বে থাকবেন একজন উপকমিশনার বা পুলিশ সুপার। এ ছাড়া দুটি অতিরিক্ত ডিআইজি পদ রয়েছে। মনিরুল ইসলাম জানান, ‘কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছি আমরা। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ আমাদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’ সিটি প্রধান বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদ ও এসবে অর্থায়ন ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রেই একটি অপরটির সঙ্গে যুক্ত। আফগানিস্তানের একটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে—সেখানকার মাদকপাচারের টাকা তালেবানদের হাতে যাচ্ছে। ফলে চোরাচালান বা মানবপাচারের মতো আন্তর্দেশীয় অপরাধে এ অর্থ ব্যবহৃত হতে পারে। এসব বিষয়ে একাধিক দেশের পুলিশ বা তদন্ত সংস্থাকে মিলেমিশে কাজ করতে হয়। সোনার চোরাচালানও ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধের আওতায় পড়ে। বিশেষ ইউনিট হিসেবে আমরা গভীরভাবে তদন্ত করার চেষ্টা করব।’ তিনি জানান, ডিবির মতো সিটিও পোশাকে বা সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে। এসটিজির সমন্বয়ক পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, গোপনীয় বিষয়াদি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, এসটিজি তিন হাজার জঙ্গির তথ্যপুঞ্জি (ডাটাবেইস) তৈরি করেছে। দেখা গেছে, কোনো কোনো জঙ্গি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। তথ্যপুঞ্জির সহায়তায় জঙ্গিদের ওপর নজরদারি করা সহজ হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) এসটিজি শাখার প্রধান হিসেবে কাজ করছেন বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মির্জা আব্দুল্লাহ-হেল বাকী। তিনি বলেন, ‘এসটিজি মূলত জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিয়ে কাজ করছে। সিলেটের ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা মামলা, ঢাকার মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা মামলাসহ কিছু মামলা এখানে আছে। আমরা ডিবি ও অন্যান্য সংস্থাকে সহায়তা করছি। জেলা থেকে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কিছু মামলাও আমরা তদন্তের জন্য নেব।’ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, নগর বিশেষ শাখার উপকমিশনার মোয়াজ্জেম হকের নেতৃত্বে সেখানকার এসটিজি শাখা কাজ করছে। এখন তারা জঙ্গি দমনে করণীয় ও কৌশল নির্ধারণ করছে। সিএমপি সূত্র জানায়, সম্প্রতি চট্টগ্রামে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১১টি কৌশল নির্ধারণ করেছে চট্টগ্রাম এসটিজি। এসবের মধ্যে রয়েছে কারাগারে ও জামিনে থাকা জঙ্গিদের তথ্য সংগ্রহ এবং জঙ্গি-সমর্থক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ব্লগ, প্ল্যাটফরম বা ওয়েবসাইটের ওপর নজরদারি।