দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের হাওয়া

প্রায় ২০ বছর প্রতীক্ষার পর অবশেষে শুরু হতে চলেছে সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলী বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ। বিমানবন্দরের জন্য আগামী জুনে প্রায় ৫৩৬ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হবে এবং জুলাই-আগস্টের মধ্যেই নির্মাণকাজের টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এরই মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে এই বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হবে। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটক রাজধানী থেকে কম সময়ে মংলাবন্দর ও ইপিজেড এলাকায় সরাসরি যেতে পারবেন এবং দেখতে পারবেন সুন্দরবনের অপরূপ বৈচিত্র্য, খানজাহান আলী (রহ.) মাজার, ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার ও স্মৃতিসৌধ। এতে করে পর্যটন খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে এবং জনজীবনে অর্থনৈতিক সচলতা দেখা দেবে। উন্নয়নের হাওয়া বইবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সমকালকে বলেন, খানজাহান আলী বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হলে মংলাবন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগসহ পর্যটন স্থানগুলোর গুরুত্ব বাড়বে; দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটবে। সরকার প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বিমানবন্দরের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী জুনে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হবে। এরপরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেশি-বিদেশি কোম্পানি অংশ নেবে। অভিজ্ঞতা ও সাশ্রয়ের কথা যারা বিশেষ বিবেচনায় আনবে, তারাই বিবেচিত হবে।
গত বছরের ৫ মে একনেক সভায় প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিমান ও সিএ উইং) আবুল হাসনাত মো. জিয়াউল হক প্রকল্পটি দেখভাল করছেন। শিগগিরই এ প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ বিমানবন্দরের নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪৪ কোটি টাকা। জুলাই-আগস্টে মূল বিমানবন্দরের টেন্ডার আহ্বান করলে দেশি-বিদেশি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে। এরপর বিমানবন্দর নির্মাণের মূল কাজসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে। ভূমি অধিগ্রহণকালে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টাকা বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিমানবন্দরের ভূমি উন্নয়ন বাবদ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মৌজা, জেএল নম্বর, সিট নম্বর, দাগ নম্বর, হুকুমদখলীয় জমির পরিমাণের আলোকে এ প্রকল্পের জন্য ৫৩৬ একর জমি কমবেশি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন করা হয়। এর আগে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা ছিল মাত্র ৯৪ একর। প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বিমানবন্দরটি আধুনিক ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, পেভমেন্ট ওয়ার্ক, অপারেশনাল ও আবাসিক ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রো মেকানিক্যাল, নেভ-এইড ইকুইপমেন্ট কেনা হবে। বাউন্ডারি ওয়াল, সিকিউরিটি ফেন্সিং, ফায়ার ভেহিক্যাল কেনা হবে; ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমও উন্নতমানের করা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন সূত্র জানায়, ১৯৯৬-২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য
সম্প্রসারণ, দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মংলাকে কার্যকর করাসহ বিভিন্ন বাস্তব কারণে বাগেরহাটের মংলায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। বিমানবন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে তৎকালীন বিমান প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সভাপতিত্বে একাধিকবার আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থল বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এই বিমানবন্দর প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনা একনেকে অনুমোদন হয়। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে রূপ দিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বৃহত্তম চিরহরিৎ বন ‘সুন্দরবন’ এ অঞ্চলে অবস্থিত। এটি শুধু স্থানীয় জনসাধারণের কাছে আকর্ষণীয় নয়, পুরো বিশ্বের কাছেও আকর্ষণীয়। এর পর্যটন এলাকা দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে পরিচিত। তাই এখানকার পর্যটন খাতকে বিকশিত করতে বিমানবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তা ছাড়া বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মংলারও খুব কাছাকাছি হবে। এরই মধ্যে এ এলাকায় গড়ে উঠেছে ইপিজেড ও অন্যান্য বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। ফলে বিমানবন্দরটি হিমায়িত চিংড়ি রফতানির ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। এটি চালু হলে দূরত্ব কমার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব-পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে আকাশ পরিবহন সেবাও প্রসারিত হবে।