বিদ্যুত হাব পায়রায় শুরু হচ্ছে ১৩শ’ ২০ মেগা বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ

শুরু হচ্ছে পায়রা-১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণকাজ। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথম বৃহৎ কয়লাচালিত বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হবে। আগামী ৩১ মার্চ থেকে মাটি উন্নয়ন এবং পাইলিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু হবে। চীন এবং বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুতকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে।

রামপাল, মাতারবাড়ি এবং পায়রাতে বড় কয়লাচালিত বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে পায়রাতে প্রথম বড় বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হতে যাচ্ছে। রামপালের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত হলেও অর্থায়ন এবং অন্যান্য বিষয় মিলিয়ে বিদ্যুতকেন্দ্রটি নির্মাণে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে। যদিও ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক রামপালে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আর কেন্দ্রটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের (ইপিসি) কাজ পাচ্ছে ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেড (ভেল)।

সূত্র জানায়, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের এনইপিসির সঙ্গে চুক্তি করা হবে। ইতোমধ্যে বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণে চীনা কোম্পানিকে সম্মতিপত্র দেয়া হয়েছে। দরপত্রের শর্তানুযায়ী চুক্তির দিন থেকেই বিদ্যুতকেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করতে হবে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে পিজি বাবদ ১ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার বা এক হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা দেবে এনইপিসি। চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করতে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ১০ দিন অর্থাৎ ৪ মার্চ পর্যন্ত চীনে বসছে প্রাক-দরপত্র বৈঠক। এখানে চীনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ইউরোপ এবং আমেরিকার যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারীরা অংশ নেবেন।

নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি সূত্র বলছে, বিদ্যুতকেন্দ্রটিকে অর্থের সংস্থান হওয়া পর্যন্ত দেরি করতে হবে না। দরপত্রের শর্তে বলা হয়েছিল, যতদিন পর্যন্ত ঋণচুক্তি বা অর্থছাড় না করা হয় ততদিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে অর্থের যোগান দিতে হবে। এতে মোট ব্যয়ের অন্তত ১৫ ভাগ অর্থ প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি একটি উপযোগী শর্ত। বিদ্যুতকেন্দ্রর কাজ শুরু হয়েছে দেখলে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়। তখন অর্থের সংস্থান সহজ হয়। অন্যদিকে চীনের খ্যাতনামা কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) বিদ্যুতকেন্দ্রের অর্ধেক মালিকানায় থাকায় অর্থ সংস্থান সহজ হবে। চীনের সরকারী প্রকল্পের অর্থায়ন সংস্থানকারী সাইনোশিওর পায়রা বিদ্যুতকেন্দ্রর অর্থ সংস্থানের চেষ্টা করছে। সাইনোশিওরের মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।

দেশে রামপাল বিতর্কের মধ্যে পায়রায় আরও একটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণে ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি চীনের সিএমসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। তবে পায়রা বিদ্যুতকেন্দ্রটিকে কোন বিরোধের মুখোমুখি হতে হয়নি। পরিবেশবাদীরা যেমন বিদ্যুতকেন্দ্রটির বিরোধিতা করেননি তেমনি স্থানীয়রাও মনে করছেন তাদের জীবন বদলে দিতে পারে আশা জাগানো প্রকল্পটি। ইতোমধ্যে বিদ্যুতকেন্দ্রটির পুনর্বাসন প্রকল্পে চমক দিয়েছে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি।

বিদ্যুতকেন্দ্রটি নির্মাণে চীন, জার্মানি এবং উত্তর আমেরিকা থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করা হবে। চীনের প্রাক-দরপত্র বৈঠকে যন্ত্রাংশ আমদানি ছাড়াও নির্মাণ প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য দিক নিয়ে আলোচনা হবে। বলা হচ্ছে, বিদ্যুতকেন্দ্রের মূল যন্ত্রাংশ আসবে চীন থেকে। সুইচরুম অর্থাৎ কন্ট্রোল প্যানেল সরবরাহ করবে জার্মানি। এছাড়া বিদ্যুতকেন্দ্রের এ্যাশ ক্যাচার আনা হবে উত্তর আমেরিকা থেকে।

নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম খোরশেদুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, কিছু যন্ত্রাংশ রয়েছে খুব স্পর্শকাতর। আমরা কখনও মানের প্রশ্নে ছাড় দিতে সম্মত হইনি। সঙ্গত কারণে আমরা চীন এবং আমেরিকা থেকেও যন্ত্রাংশ আমদানি করব। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আমরা ৩১ মার্চ থেকে বিদ্যুতকেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু করতে চাই। এজন্য মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুতকেন্দ্রটির নির্মাণ চুক্তি করা হবে। প্রথমে সয়েল রিবন্ডিং (যন্ত্রের সাহায্যে মাটিকে নির্মাণ উপযোগী করে তোলা) করা হবে। এমনিতে পায়রার মাটি ভাল। তারপরও ভূমিকম্পে যাতে কোন ক্ষতি না হয় এজন্য রিবন্ডিং করা হবে। এজন্য তিন মাস সময় প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে পাইলিংয়ের কাজও শুরু করা হবে। তিনি জানান, আমাদের এখানেই প্রাক-দরপত্র বৈঠক হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু যেহেতু অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান নির্মাণে কাজ করবে তাই আমরা যাচ্ছি।

এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রীয় নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি। ২০১৪ সালে স্বাক্ষর হওয়া ওই এমওইউর আলোকে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি নামে একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন করা হয়। এই কোম্পানিটি বাংলাদেশে বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ করছে যাতে উভয় দেশের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে।

কলাপাড়ায় মধুপুর এবং দেবপুর মৌজার মধুপাড়া, নিশানবাড়িয়া, দশরহাউলা, মরিচবুনিয়া গ্রামের ৯৮২ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ করা হয়েছে। চলছে পুনর্বাসন প্রকল্পর কাজ। বিদ্যুতকেন্দ্রটির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ১৩২ পরিবারের জন্য একটি নতুন আধুনিক গ্রাম তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুতকেন্দ্রটি দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রার খুব কাছে নির্মাণ করা হবে। এজন্য কয়লা খালাসে তেমন সমস্যা হবে না। আন্ধারমানিক এবং রামনাবাদ নদীর মোহনায় বিদ্যুতকেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে গ্রীষ্ম মৌসুমে ৬ মিটার এবং বর্ষায় ১৩ মিটার ড্রাফট পাওয়া যাবে। গভীর সমুদ্র থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরত্বে বার্জে কয়লা পরিবহন করা হবে।

সিএমসি দেশের একমাত্র তাপ বিদ্যুতকেন্দ্র বড়পুকুরিয়া-২৫০ মেগাওয়াট নির্মাণ করেছে। বড়পুকুরিয়ার বিদ্যুতকেন্দ্রটি সাব-ক্রিটিক্যাল হলেও পটুয়াখালীর বিদ্যুতকেন্দ্র হবে সুপার আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির। বিদ্যুতকেন্দ্রটি আমদানি করা কয়লা দিয়ে চলবে। বিদ্যুতকেন্দ্রটি নির্মাণে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে। দেশের রাষ্ট্রীয় কোন কোম্পানির এটিই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের একক প্রকল্প।