চিকিৎসা খাতে দ্রুত উন্নতি

বিভিন্ন রকম দুর্নাম থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে দেশের চিকিৎসাসেবা খাতে উন্নতির কমতি নেই। সরকারি ৬১২টি বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সঙ্গে প্রায় চার হাজার ৩০০ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে প্রতিদিন চলছে চিকিৎসাসেবা। অনিয়ম ও অবৈধ পথে গড়ে ওঠা কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বাদে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তির দেখা মেলে রাজধানী থেকে শুরু করে অনেক ছোটখাটো শহরেও। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে অসাধু কিছুসংখ্যক চিকিৎসাকর্মী বাদে বেশির ভাগ চিকিৎসাকর্মীই দিনরাত কাজ করে চলছেন মানুষের সেবা দিতে। ফলে দেশে এখন পুরনো রোগবালাইসহ নিত্যনতুন রোগ বা জটিল রোগের চিকিৎসাও চলছে অনেক হাসপাতালে। দেশেই গড়ে উঠেছে বিশেষায়িত চিকিৎসার অনেকগুলো কেন্দ্র। আবার সম্মিলিত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোয়ও চলছে উন্নত চিকিৎসা কার্যক্রম। বেসরকারি পর্যায়ের নামিদামি কয়েকটি হাসপাতালে গলাকাটা ব্যয় হলেও চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই অন্যদের তুলনায়। চিকিৎসাসেবায় দেশের এমন উন্নত অবস্থানকে পুঁজি করেই দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য বিদেশে না যাওয়ার ব্যাপারে চলছে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ। যদিও তা উপেক্ষা করে বিত্তশালীরা তো বটেই সরকারি পর্যায়ের অনেকেই চিকিৎসার জন্য ছোটেন বিদেশে। তবে এমন প্রবণতা কমিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দিয়েছেন—অসুস্থ হলে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন না, বরং দেশেই যেন তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই আন্তরিক। বর্তমানে দেশের চিকিৎসাসেবায় যে উন্নতি ঘটেছে এর অবদান নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রধানমন্ত্রী দেশের চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নজির রেখেছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর চিকিৎসক নিয়োগ, নার্স নিয়োগ, হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি, বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ, নিত্যনতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি সংযোজন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর উন্নয়ন—সব কিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কমিউনিটি ক্লিনিক বাদেই দেশের নিয়মিত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে বছরে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে আড়াই কোটির বেশি মানুষ। আর মাঠপর্যায়ের কেবল সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি (অনেকেই একাধিকবার সেবা নিয়েছে)। এর ফাঁক গলে বছরে মাত্র আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে ছুটে যায় বলে ধারণা করা হয়, যাদের বেশির ভাগই উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। একই তথ্যসূত্র অনুসারে বছরে কেবল সরকারি হাসপাতালে আউটডোরে সেবা নেয় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। জরুরি বিভাগে সেবা নেয় প্রায় ৯ লাখ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, সব সেবা খাতেই কিছু না কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। আর যে সেবার পরিধি বেশি বিস্তৃত সে খাতে ত্রুটি-বিচ্যুতিও বেশি চোখে পড়ে। তবে এসব ছাপিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিনই সেবা নিচ্ছে দেশেরই কোনো না চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র থেকে। আর এর উপকার পাচ্ছে বেশির ভাগ সেবা গ্রহণকারী। ফলে যে গুটিকতক মানুষ কথায় কথায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটে যায় তাদের নিয়ে উদ্বেগের তেমন কিছু নেই। অবশ্য ওই প্রবণতার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো বা প্রযুক্তি যতটা না দায়ী এর চেয়ে বহুগুণ দায়ী করা হয় এক শ্রেণির চিকিৎসকের আচরণকে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই গত ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে গাজীপুরের কাশিমপুরের তেঁতুইবাড়ীতে নিজের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যান অনেকটা হঠাৎ করেই। হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি যদি কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাহলে আপনারা আমাকে বিদেশে নেবেন না। এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠাবেন না। আমি দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেব। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেব।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কেবল প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাই নয়, দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন, সংশোধন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালসেবার মানোন্নয়নে আর্থিক, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নীতি, আইন, বিধি প্রণয়ন, সূচক নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণেও কাজ করা হয়। হাসপাতালবিষয়ক উন্নয়ন কর্মসূচি, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও স্বাস্থ্য বীমা কার্যক্রমেও হাত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশি ও বিদেশি যৌথ উদ্যোগে (বিদেশি বিনিয়োগে) নির্মিত ও পরিচালিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশি চিকিৎসকদের বাংলাদেশে আগমন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান-প্রক্রিয়া সহজতর করা হয়েছে। অন্যদিকে দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-উত্তর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ওষুধসামগ্রী ও মেডিক্যাল টিম পাঠানো, আপৎকালীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় যেকোনো দুর্ঘটনায় ভবনধসসহ ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, এজমাসহ অন্যান্য বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ/হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শনসহ আকস্মিক পরিদর্শন এবং সে অনুসারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও জোরালোভাবে এগিয়ে চলছে। বিশেষ করে সম্প্রতি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ কার্যক্রমের আওতায় ১২ তলা নতুন ভবন নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ও হাসপাতালের হিসাব বিভাগ, বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগসহ সব বিভাগে পর্যায়ক্রমে অটোমেশন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একটি স্বতন্ত্র ইলেকট্রো ফিজিওলজি বিভাগ চালু করা হয়। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি, ক্যান্সার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে দেশেই বিশেষায়িত চিকিৎসাকে উৎসাহিত করা হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরীয় সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের সহজ শর্তে দেওয়া ঋণ সহায়তায় দেশের প্রথম সেন্টার বেইজড সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় এ-সংক্রান্ত প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।