শিল্পের জমি দেবে ‘ল্যান্ড ব্যাংক’

বিনিয়োগের প্রথম বাধা জমি প্রাপ্তি। সেই বাধা দূর করতে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এর পাশাপাশি শিল্প মালিকদের চাহিদা মেটাতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা খাসজমি ও চরাঞ্চলের ভূমি নিয়ে একটি ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ বা ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করবে সরকার। অনুন্নত এলাকায় শ্রম নিবিড় শিল্পের উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য আগ্রহী শিল্প মালিকদের ওই ল্যান্ড ব্যাংক থেকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় গ্যাস এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে সরকার। এ ছাড়া বিনিয়োগের পরিমাণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বিবেচনা করে কেইস টু কেইস ভিত্তিতে বৃহৎ আকারের শিল্প উদ্যোগকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) শিল্পগুলোকে যে ধরনের সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়, তার সমতুল্য প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা দেবে সরকার। জাতীয় শিল্পনীতি, ২০১৬-তে এভাবেই বিনিয়োগে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের জন্য জমির সংকট দূর করার কথা বলেছে সরকার। ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপযোগী করে শিল্পনীতির চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা আজ বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন পেতে পারে। শিল্পনীতিতে মেট্রোপলিটন শহরে গড়ে ওঠা দূষণপ্রবণ ও অপরিকল্পিত কারখানাগুলোকে পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। স্থানান্তরে উদ্যোগী শিল্প মালিকদের বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেবে সরকার। শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান এখনকার ২৯ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং শ্রমশক্তির অবদান ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে এই শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের রূপকল্প ২০২১, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১১-২০১৫ মূল্যায়ন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৬-২০২১, চতুর্থ ইস্তাম্বুল প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন ২০১১-২০২০, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫-২০৩০ অনুসরণ করে শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে শিল্প খাতকে বেগবান করে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে দেশজ জাতীয় উৎপাদনে শিল্প খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা এই শিল্পনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ প্রণোদনা : গতিশীল শিল্পায়ন ও টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে উচ্চ অগ্রাধিকার ও অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত এবং উপখাতগুলোতে বিনিয়োগে প্রণোদনা দেবে সরকার। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ বোর্ডসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। শিল্পায়নে পশ্চাৎপদ ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এলাকায় নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা বা সম্প্রসারণে মূলধনী বিনিয়োগের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকি দেবে সরকার। ওই সব শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের ওপর শুল্ককর অব্যাহতি দেওয়া, অ্যাক্রেডিটেশন সনদের ফি বা চার্জ এবং বীমা স্কিমের প্রিমিয়ামের খরচ সরকার পুনর্ভরণ করবে। তাদের জন্য চলতি মূলধনের সুদের ওপরও ভর্তুকি দেবে সরকার। শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, এলাকাভেদে বিভিন্ন শিল্পখাত-উপখাতে কর অবকাশ ও অবচয় সুবিধা দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বিশেষ প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা, কর অব্যাহতি, দ্বৈতকর থেকে অব্যাহতি ও কমহারে করারোপ করা হবে। এসব সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে উচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলো বিশেষ প্রাধান্য পাবে। শিল্প এলাকায় স্থাপিত শিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া হবে। বর্তমানে অনেক কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ও সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্যের আমদানি শুল্ক সমান। ফলে ব্যবসায়ীরা কারখানায় উৎপাদনের চেয়ে প্রস্তুত পণ্য আমদানিতেই উৎসাহী হচ্ছেন। শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে ব্যবহূত আমদানি করা কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ককর হার সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত পণ্য আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ককর হার থেকে কম হবে।’ রপ্তানিমুখী ও রপ্তানি সংযোগ শিল্প-কারখানা স্থাপনের পর উৎপাদন শুরুর পর থেকে প্রথম তিন বছর বড় ধরনের প্রণোদনা দেবে সরকার। এর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক রেয়াত, শুল্ক প্রত্যাবর্তন সুবিধা, অপরিবর্তনীয় ও নির্ধারিত ঋণপত্র বা বিক্রয়চুক্তির বিপরীতে ৯০ ভাগ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুবিধা, কর অবকাশ বা কোনো কর রেয়াত ভোগ না করা প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয়ের ৫০ ভাগ করমুক্ত সুবিধা পাবে। এ ছাড়া বিসিকে নিবন্ধিত হস্ত ও কারুশিল্প রপ্তানি আয় শতভাগ করমুক্তি পাবে। ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদিত ১০ ভাগ পণ্য শুল্ককর পরিশোধ সাপেক্ষে দেশের ভেতরে বিক্রি করা যাবে। অন্য এলাকায় স্থাপিত শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের ২০ ভাগ দেশের ভেতরে বিক্রি করা যাবে। প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা মূলধনের শতভাগ প্রত্যাবাসন এবং মুনাফার সম্পূর্ণ স্থানান্তর করতে পারবেন। মুনাফার অর্থ পুনর্বিনিয়োগ করলে তা নতুন বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সুবিধা দেওয়া হবে। রেমিট্যান্স পাঠানো ছাড়াও প্রবাসীরা বাংলাদেশ থেকে বেশি পণ্য আমদানি করলে তাদের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) মর্যাদা দেবে সরকার। প্রবাসীদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্প বিনিয়োগ মিউচ্যুয়াল ফান্ড’ গঠন করা হবে। বাংলাদেশে নিবন্ধিত হওয়াসাপেক্ষে কোনো বিদেশি নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান দেশে প্রতিষ্ঠিত সরকারি-বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানের শতভাগ মালিকানা অর্জন করতে পারবে। তারা দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। বিদেশি বিনিয়োগ : বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। শিল্পায়নের গতি সঞ্চারে বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়া হবে। তাদের জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার সমন্বিত ওয়ানস্টপ সার্ভিস সুবিধা নিশ্চিত করবে। কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলে বা ২০ লাখ ডলার কোনো স্বীকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীকে স্থায়ী রেসিডেন্টশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে ন্যূনতম ৭৫ হাজার ডলার বিনিয়োগের যে শর্ত রয়েছে, তা বাড়িয়ে দুই লাখ ডলার করা হবে। সম্ভাবনাময় বিনিয়োগকারীদের কমপক্ষে পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা দেওয়া হবে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের মতোই কর অবকাশ, রয়্যালটি, প্রযুক্তি কৌশল ফিতে ছাড় পাবেন বিদেশিরা। বাংলাদেশে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিবন্ধিত শিল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত বিদেশি কারিগরদের এনবিআর অনুমোদিত মেয়াদে আয়কর পরিশোধ করতে হবে না। আর কর পরিশোধসাপেক্ষে বিদেশি বিনিয়োগের মুনাফা শতভাগ স্থানান্তর করা যাবে। এক কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগকারী বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে ‘নো ভিসা রিকুয়ার্ড (এনভিআর)’ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্পের উন্নয়ন : শিল্পনীতিতে ক্ষুদ্র, মাঝারি (এসএমই) ও কুটিরশিল্পের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকায় সহযোগী শিল্প বিকাশের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত কারখানার চাহিদা মোতাবেক কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং সেবামূলক শিল্পগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হবে। এসএমই উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও উন্নয়নে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ওভিওপি) নীতি গ্রহণ করবে সরকার। এসএমই খাতের ঋণ সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠন করে ঋণ দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন সমস্যা চিহ্নিত করে জামানতবিহীন ও ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণ দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় এসএমই পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। অগ্রাধিকার খাত : শিল্পনীতিতে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, তৈরি পোশাক, আইসিটি ও সফটওয়্যার, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হাল্কা প্রকৌশল শিল্প এবং পাট ও পাটজাত শিল্পকে উচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্লাস্টিক, জনশক্তি রপ্তানি, জাহাজ নির্মাণ, পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, হিমায়িত মৎস্য, হোম টেক্সটাইল সামগ্রী, নবায়নযোগ্য শক্তি, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যাল, ভেষজ ওষুধ, তেজস্ক্রিয় রশ্মির (বিকিরণ) প্রয়োগ শিল্প, পলিমার উৎপাদন, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, অটোমোবাইল প্রস্তুত ও মেরামতকারী শিল্প, হস্তু ও কারুশিল্প, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও উন্নয়ন, চা, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী, জুয়েলারি, খেলনা, প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজ, বাইসাইকেল ও আগর শিল্পকে অগ্রাধিকার শিল্পখাত হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে শিল্পনীতিতে।