‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র শিশুপাঠ্য সংস্করণ ‘মুজিব’

‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটিকে শিশুদের উপযোগী করে প্রকাশ করা শুরু হয়েছে। মূল গ্রন্থটি শিশুদের জন্য পড়াটা কঠিন, সে কারণেই শিশুদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতেই এই উদ্যোগ। গ্রাফিক নভেল হিসাবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে এটি। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও বলছে গ্রাফিক নভেল। এ বইয়ের মাধ্যমে ছোট্ট শিশুরা সহজভাবে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনকে জানবে, চিনবে। বইটি প্রকাশ করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন- সিআরআই। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সিরিজ বইটির নাম দিয়েছে ‘মুজিব’। বইটির প্রকাশক বঙ্গবন্ধুর নাতি শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং বিদ্যুত্ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। মূল গ্রন্থটিকে অবলম্বন করেই এ বইটি সাজানো হচ্ছে। সম্পাদনা করছেন শিবু কুমার শীল। গ্রাফিক ডিজাইন ও চিত্রন করেছেন সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময় ও এ বি এম সালাহউদ্দিন শুভ।

সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যান্য বিষয় নিয়ে ধাপে ধাপে প্রকাশিত হবে আরও ১২টি খণ্ড। প্রথম খণ্ডটি গেল বছর বঙ্গবন্ধুর ৯৬তম জন্মদিনে প্রকাশ করা হয়, বইমেলায় সিআরআই-এর স্টলে। বাংলা একাডেমি অংশে স্টল নম্বর-১০০/জ। এবছর দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশ করা হবে। আগামী শনিবার বইমেলায় শিশু প্রহরে সকাল ১১টায় দ্বিতীয় খণ্ডটির মোড়ক উন্মোচন করা হবে। সম্পাদক শিবু কুমার শীল বলেন, বইটিতে সংলাপ প্রাধান্য পাচ্ছে। আমরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রাখতে ঘটনার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। শিশুদের বোঝার সুবিধার জন্য ‘ফিকশন’ আকারে করা হচ্ছে তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘটনা এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে সংলাপ দিতে হচ্ছে। তবে পাণ্ডুলিপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখে দেন। তার অনুমতি পাওয়ার পরেই আমরা তা প্রকাশ করছি।

রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক বলেন, ছোটবেলা থেকে মা-খালার কাছ থেকে নানার (বঙ্গবন্ধু) অনেক গল্প শুনতাম এবং অনেক প্রশ্ন করতাম। নানা কেমন ছিলেন, উনি কি করতেন ইত্যাদি। ধীরে ধীরে তাঁকে জানতে পারি। আমার মত এখনকার শিশুরাও নিশ্চয়ই তাকে জানতে চান। সে কারণেই শিশুদের উপযোগী করে বই প্রকাশের এ উদ্যোগ।

‘মুজিব’-এর প্রথম খণ্ডে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট, জন্ম ও শৈশব এবং ছোটবেলাতেই চোখে চশমা ওঠার ঘটনা ও প্রথম জেলে যাওয়ার গল্প এসেছে। আর দ্বিতীয় খণ্ডে বঙ্গবন্ধুর অবিভক্ত ভারতের তত্কালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা এবং ফুটবল খেলা বিষয়ক কিছু মজার ঘটনা বলা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তত্কালীন ভারতে যে দুর্ভিক্ষের সূচনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু সেই সময়ে কিভাবে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাও বর্ণিত হয়েছে।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম নেন শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’। তার হাত ধরেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, তিনি হয়ে ওঠেন ‘জাতির জনক’। ১৯৬৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় স্ত্রী ও সহযোদ্ধাদের উত্সাহে আত্মজীবনী লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন শেখ মুজিব, যা আর শেষ করা হয়নি। ৪৪ বছর পর তার মেয়ে শেখ হাসিনার হাত দিয়ে সেই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই আকারে প্রকাশিত হয়।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর কথা

২০০৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আসে। খাতাগুলো অতি পুরনো, পাতাগুলো জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। মূল্যবান সেই খাতাগুলো পাঠ করে জানা যায়, এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। জেল-জুলুম, নিগ্রহ-নিপীড়ন যাঁকে সদা তাড়া করে ফিরেছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উত্সর্গীকৃত প্রাণ, সদাব্যস্ত বঙ্গবন্ধু যে আত্মজীবনী লেখায় হাত দিয়েছিলেন এবং কিছুটা লিখেছেনও, এই বইটি তার স্বাক্ষর বহন করছে। বইটিতে আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট, বংশ পরিচয়, পিতা-মাতা, জন্ম, শৈশব, স্কুল ও কলেজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, কলকাতা কেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণসহ এসব বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। আরো আছে কারাজীবন, চীন-ভারত-পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের বর্ণনা এবং পরিবার, বিবাহিত জীবন, সন্তান-সন্তুতি ও ‘সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণী’র কথা, যিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন।