স্বল্প ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ

যেতে পারবে ১৫ লাখ কর্মী, বাংলাদেশিরা কাজ পাবেন ১৫ খাতে জিটুজি প্লাস অনুমোদনের জন্য আজ মন্ত্রিসভায় উঠছে

বেসরকারি রফতানিকারকদের যুক্ত করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে বহুল আলোচিত ‘জিটুজি প্লাস’ আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। সরকারি অনুমোদন পেলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করবে বাংলাদেশ। আর এ চুক্তি হলে আগামী তিন বছরে দেশটিতে স্বল্প ব্যয়ে ১৫ লাখ পর্যন্ত কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের জন্য। জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি রিত্রুক্রটিং এজেন্সিগুলো কর্মী পাঠাবে। কর্মীপ্রতি ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ লাগতে পারে।

দু’দেশের মধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে দুই দেশের সমঝোতা স্মারকের খসড়া অনুমোদনে জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে। দুই দেশের সরকারের খসড়া অনুমোদনের পর পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হবে। সরকারি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কাজী আবুল কালাম বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হবে।

এর আগে গত ৯ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য জিটুজি প্লাস উত্থাপন করার কথা ছিল। মালয়েশিয়ার আপত্তির কারণে শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। মালয়েশিয়ার শর্ত ছিল, কর্মী ব্যবস্থাপনার কাজ অবশ্যই মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে। এ শর্তের কারণে পিছিয়ে যায় জিটুজি প্লাস। তবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি সমকালকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার কোনো শর্ত ছিল না। সমঝোতা স্মারকের খসড়ার বিভিন্ন দিক ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে সময় নেয় দুই দেশ।’ মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কর্মী ব্যবস্থাপনার কাজ দেওয়া হবে না বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানের অতীত রেকর্ড ভালো, তারা কাজ পাবে। সব রফতানিকারকই কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে।’

গত বছরের জুনে মালয়েশিয়ান উপপ্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদি বাংলাদেশ থেকে তিন বছরে ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রবাসী কর্মী নেওয়ার বিরোধী। তাদের অভিযোগ, প্রবাসী কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতির দ্বার খুলেছেন মালয়েশিয়ান রাজনীতিবিদরা। দেশটির গণমাধ্যমের খবর, মালয় উপপ্রধানমন্ত্রী কর্মী ব্যবস্থাপনার কাজ তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানকে দিতে চান। তিনি দাবি জানিয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রীকে চিঠিও দিয়েছিলেন।

জনশক্তি রফতানিকারক রিত্রুক্রটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সভাপতি আবুল বাশার বলেন, সাধারণ রফতানিকারকরা জিটুজি প্লাস দ্রুত বাস্তবায়ন চান। কিন্তু চুক্তির নামে যদি কোনো বিশেষ কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়, তা মেনে নেবেন না তারা। সূত্র জানায়, মালয় রাজনীতিকদের ঘনিষ্ঠ ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূূত মালয়েশিয়ানদের প্রতিষ্ঠান সানারফ্ল্যাক্স ও বেস্টিনেটকে কর্মী ব্যবস্থাপনার কাজ দিতে চায় জনশক্তি খাতে ‘সিন্ডিকেড’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপ।

বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। তিন বছর চেষ্টার পর মালয়েশিয়া কর্মী নিতে রাজি হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় (জিটুজি) কর্মী পাঠাতে ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়। জিটুজিতে মালয়েশিয়ান সরকারের চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার কর্মী পাঠাত। পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ কর্মী পাঠানোর কথা থাকলেও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে মাত্র নয় হাজার কর্মী নেয় মালয়েশিয়া।

জিটুজির ব্যর্থতায় সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। গত বছরের এপ্রিলে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের অর্ধশত গণকবর আবিষ্কৃত হয়। নিহতের সবাই সাগরপথে মানব পাচারের শিকার। হাজারো মানুষের মৃত্যুতে সারাবিশ্বে সমালোচনার ঢেউ ওঠে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত আগের ১৫ মাসে ৭৮ হাজার মানুষ সাগরপথে পাচার হয়েছে। তাদের অন্তত আট হাজার পথে নিহত হয়েছেন।

সমালোচনার মুখে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয়। গত বছরের জুনে তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মালয়েশিয়া সফরের পর জানানো হয়, কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব বেসরকারি খাতে (বিটুবি) ছেড়ে দেওয়া হবে। মালয়েশিয়ান বেসরকারি নিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিকারকরা কর্মী পাঠাবেন।

দুই মাস পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে দুই দেশ। গত আগস্টে মালয়েশিয়ান প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফর শেষে জানানো হয়, বিটুবি নয়, সরকারি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি রফতানিকারকদের যুক্ত করে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো হবে।

জিটুজি পদ্ধতিতে শুধু বনায়ন খাতে (প্ল্যান্টেশন) কর্মী নিত মালয়েশিয়া। নূরুল ইসলাম জানান, জিটুজি প্লাসে সেবা, নির্মাণ, কারখানা, কৃষি, বনায়নসহ মোট ১৫টি খাতে কর্মী পাঠানো হবে। মাসখানেকের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এভাবে একজন কর্মী পাঠাতে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে।

জিটুজির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় ২০১২ সালে যেতে প্রায় ১৫ লাখ কর্মী নিবন্ধন করেন। সারাদেশে বিপুল সাড়া পড়ে। জিটুজির ব্যর্থতায় তাদের প্রায় ৯৯ ভাগই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পাননি। আগে যারা নিবন্ধন করেছেন, তাদের থেকেই কর্মী পাঠানো হবে বলে জানান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। তবে নতুন করে নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৩০ হাজার ৪৮৩ কর্মী বৈধপথে মালয়েশিয়ায় কাজ করতে গেছেন। চলতি বছরের প্রথম মাসে গেছেন আরও সাড়ে ১২ হাজার কর্মী। জিটুজি প্লাস কার্যকর হলে এ সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মালয়েশিয়ান সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন। বাংলাদেশিসহ সব অবৈধ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে।