লুঙ্গি রফতানিতে বছরে আয় ১২শ’ কোটি টাকা

বিশ্ববাজারে খ্যাতি রয়েছে বাংলাদেশের তাঁতীদের তৈরি উন্নতমানের লুঙ্গির। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ২৫টি দেশে প্রায় দুই কোটি পিস লুঙ্গি রফতানি হচ্ছে। আর এ খাত থেকে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এমন দাবি খাতটির ব্যবসায়ীদের।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের প্রায় এক কোটি শ্রমিক বিদেশে কাজ করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালিরাই মূলত এসব লুঙ্গির প্রধান ক্রেতা। তবে ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশের লোকজন শখ করে বাংলাদেশী লুঙ্গি কেনেন। তাদের চাহিদা পূরণ করতেই মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে তারা লুঙ্গি রফতানি করছেন।

বাংলাদেশ লুঙ্গি ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আমানত শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. হেলাল মিয়া বলেন, দেশ থেকে প্রতিবছরই লুঙ্গি রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালো। রফতানিতেও অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে তৈরি পোশাকের পর লুঙ্গি দিয়েই বিশ্ববাজারে নতুন জায়গা করে নেয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সম্প্রতি ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এই লুঙ্গির বাজারে। রং ও ডিজাইনে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে লুঙ্গি সবার কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লুঙ্গি এখন শুধু বাঙালি পুরুষের পোশাকই নয়। গুণ-মান এবং ভালো ডিজাইনের কারণে বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে নজর এখন বিদেশীদেরও। তবে বাংলাদেশী লুঙ্গির বড় ক্রেতা ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বাংলাদেশ থেকে লুঙ্গি ভারতে নিয়ে সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছেন। এই লুঙ্গি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে প্রতি পিস এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জানা যায়, দেশে ১৯৯৮ সালে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ার লুমে লুঙ্গি তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে এ ধরনের তাঁতে ৭০ ভাগ লুঙ্গিই তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া চিত্তরঞ্জ ও পিটলুমেও লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে লুঙ্গি প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয়ভাবে লুঙ্গি তৈরি ও বিক্রি করে থাকে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই তাঁত মালিকদের কাছে অর্ডার দিয়ে লুঙ্গি তৈরি করিয়ে নেয়। পরে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতীক বা স্টিকার লাগিয়ে বাজারজাত করে। তাঁতীরা জানান, একসময় নামে-বেনামে বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন পরিচিতি পাচ্ছে নিজস্ব ব্র্যান্ডে। দেশে প্রথম লুঙ্গি ব্র্যান্ডিং শুরু করে নরসিংদীর হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স। বাজারে সোনার বাংলা টেক্সটাইল, ডিসেন্ট, ইউনিক, স্ট্যান্ডার্ড, আমানত শাহ, রুহিতপুরী, স্মার্ট, অমর, পাকিজা, এটিএম, বোখারি, ফজর আলী, অনুসন্ধান, জেএম, স্কাই, ওয়েস্ট, রংধনুসহ ১২৫ ব্র্যান্ডের লুঙ্গি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ৮০/৮০, ৬২/৮০, ৬২/৬২, ৪০/৬২, ৪০/৪০ কাউন্ট সুতার লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। মানভেদে প্রতি পিস লুঙ্গি ২২০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভারতের মালদহ জেলার আমদানি ও রফতানিকারক এমএম ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী অজিত দত্ত জানান, ভারতের আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ পিস লুঙ্গি ক্রয় করে থাকেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ১২ জন আমদানি-রফতানিকারক বাংলাদেশের আতাইকুলা, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, বেলকুচি, করোটিয়া ও বাবুরহাট থেকে লুঙ্গি কিনে সড়কপথে ট্রাকে করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার ও দিল্লিতে মজুদ করেন। এরপর সেখান থেকে ভারতের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগিয়ে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, লেবানন, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে।