ফেয়ার প্রাইস কার্ডে ১৫ টাকা কেজিতে চাল!

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন বাজারে চালের দাম ছিল ২০ টাকা কেজি। চালের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় বিরোধী শিবির এ নিয়ে নানা সময় টিপ্পনী কেটেছে। সেই সময় না পারলেও এবার সরকার বাজারদরের অর্ধেকেরও কমে এক কোটি দরিদ্র মানুষকে চাল খাওয়ানোর মহাপরিকল্পনা করছে। সরকার খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল এবং ১৪ টাকা দরে আটা বিক্রি করবে। কম দামের এসব খাদ্যপণ্য বিক্রির জন্য সরকার সারা দেশে আনুমানিক ১৮ লাখ ফেয়ার প্রাইস কার্ড বিতরণ করবে। এ ছাড়া ওএমএসের পরিসর রাজধানীর চৌহদ্দি ছাড়িয়ে উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে। গত মঙ্গলবার এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, খাদ্যসচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা খাদ্য সেক্টরে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চাই। ১৫ টাকা কেজি দরে চাল এবং ১৪ টাকা কেজিতে আটা বিক্রির চিন্তা করছি। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।’ বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, মূলত বৈঠকটি হয়েছে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের অনুরোধেই। কারণ খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে এখন রেকর্ড পরিমাণ মজুদ রয়েছে। এই ভাণ্ডার খালি করতে না পারলে দুই দিক থেকেই বিপদ। প্রথম বিপদ হচ্ছে গুদাম খালি না করলে নতুন চাল কেনা যাবে না। কৃষককে ন্যায্য দাম দিতে হলে তাদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করতেই হবে। আর দ্বিতীয় বিপদ হচ্ছে গুদামে যে চাল রয়েছে তার মধ্যে অর্ধেকই ঝুঁকির মধ্যে। কারণ সবকিছুরই একটা মেয়াদ আছে। কিছু চালের মেয়াদ এরই মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় গুদাম খালি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সরকার টিআর, কাবিখা, ভিজিএফ, ভিজিডি এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কেন গুদাম খালি করতে পারছে না জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত অন্য এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা (পিআইও) চাল বা গমের মাধ্যমে টিআর কর্মসূচি চালাতে চান না। এমপিরাও প্রকল্পে চাল বা গমের বরাদ্দ নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। কারণ চাল বা গমের বিনিময়ে শ্রমিক পাওয়া যায় না। শ্রমিকরা নগদ টাকা চায়। এ কারণে প্রায় সব টিআর প্রকল্পের চালই বিক্রি করে দেওয়া হয়। জেলা পর্যায়ের খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী এবং ক্ষমতাসীন দলের কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর সিন্ডিকেট কাগজপত্রে এসব চাল কিনে রাখে। চাল বিক্রির নগদ টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু চাল বরাদ্দ করা হয় ৩২ টাকা কেজি দরে। অথচ এসব চাল বিক্রি করলে ১৬ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। ফলে সেই অর্ধেক টাকাতেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। একজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে সরকার কাবিখা কর্মসূচি চালাচ্ছে না। পরিবর্তে কাবিটা চলছে। কাবিখা কর্মসূচির আওতায় চার লাখ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এই চালের একটাও গুদাম থেকে বের হয়নি। আর টিআর কর্মসূচিতেও চার লাখ টন চাল বরাদ্দ রয়েছে। এই দুই কর্মসূচির প্রায় আট লাখ টন চাল গুদামে পড়ে আছে। এদিকে টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচিতে চাল ও গমের পরিবর্তে নগদ অর্থ বরাদ্দ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। গতকাল সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের হুইপ আতিউর রহমান আতিকসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য এই দাবি তুললে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেন। টিআর ও কাবিখা কর্মসূচিতে নগদ টাকা দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অর্থমন্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। এ বিষয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করে এটা বাস্তবায়ন করবেন।’ সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেন, ‘২০০৮ সালে আমাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কোনো কথা ছিল না। হয়তো মাঠ পর্যায়ের কেউ এ প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। তার পরও আমরা কম দামে চাল বিক্রির কথা ভাবছি। ১০ টাকা কেজি দরে না পারলেও ১৫ টাকা দরে সম্ভব। ২০০৯ সালে বাজারদর ছিল কেজিপ্রতি ২০ টাকা। তখন ১০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে সেটা বাজারদরের অর্ধেকই হতো। এখন বাজারে চালের দাম ৩২ টাকা কেজি। সেটা যদি ১৫ টাকায় বিক্রি করা হয় তাহলে বাজারদরের চেয়ে তা অর্ধেকেরও কম হবে। আমরা ২০১১ সালে আট টাকা কেজিতে প্রায় চার কোটি মানুষকে চাল খাওয়ানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। কারণ খরার জন্য রাশিয়ায় ফলন কম হয়েছিল। কোনো কারণে দেশে একটি ফসল নষ্ট হলে তার ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি আর নেই। এখন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। রপ্তানিও হয়। আর মানুষের খাদ্যাভ্যাসও পাল্টেছে। তাই এক কোটি মানুষকে হ্রাসকৃত মূল্যে ভাত খাওয়ানো কোনো বিষয়ই নয়।’ মঙ্গলবারের বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, যেভাবেই হোক সরকারকে চাল কিনতেই হবে। তা না হলে কৃষক জিম্মি হয়ে যাবে। তাদের ন্যায্য দাম দিতে হলে সরকারিভাবে চাল কেনার কোনো বিকল্প নেই। বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি ছিলেন না। এ সময় তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, চাল দিয়ে প্রকল্প চলে না। এমপিরা কোনো প্রকল্পে চাল নিতে চান না। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে বলেন। এ সময় খাদ্য অধিদপ্তরের পক্ষে সারা দেশে রেশন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। রেশন দেওয়া হবে ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে। সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে ১৮ লাখ ফেয়ার প্রাইস কার্ড দেওয়া হবে। গতকাল খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সারা দিনই ব্যস্ত ছিলেন মহাপরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে। খাদ্যমন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে গিয়েছেন। আগামী রবিবার তিনি ফিরবেন। পরদিন মন্ত্রিসভা বৈঠকের পরই মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করতে চান বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তিনি জানিয়েছেন। এ কারণে রবিবারের মধ্যেই তাঁরা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন। উল্লেখ্য, সরকারের গুদামে বর্তমানে ১৪ লাখ ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৩৩ হাজার টন চাল এবং তিন লাখ ৫০ হাজার টন গম। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকার এসব চাল সংগ্রহ করেছে ৩২ টাকা আর গম ২৮ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে ঢাকায় ওএমএস কর্মসূচিতে প্রতি কেজি চাল বিক্রি করা হয় ২০ আর আটা ১৯ টাকা কেজি দরে।