ঘুরে দাঁড়িয়েছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প

ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’। নানা বিপত্তি কাটিয়ে এ প্রকল্পে বর্তমানে গরিব মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। সঞ্চয়ের বিপরীতে প্রকল্প থেকে ‘উৎসাহ সঞ্চয়’ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৭১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর গড়ে ওঠা গ্রাম সমিতিগুলো স্থায়ী তহবিল গঠনের জন্য পেয়েছে ৯৪৭ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে তহবিলের পরিমাণ ২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা, যা প্রতিদিনই বাড়ছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের মেয়াদ এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা হলেও ৩০ জুন পর্যন্ত আনুমানিক ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। প্রকল্প দলিলে দরিদ্রদের জন্য বোনাস এবং ঘূর্ণায়মান তহবিলে মোট ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বরাদ্দ আছে। কিন্তু এডিপিতে ঠিকমতো বরাদ্দ না পাওয়ায় এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৭৪০ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হবেন গরিব সদস্যরা। বিষয়টি অনুধাবন করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ব্যয়-বৃদ্ধি ছাড়াই আরও এক বছরের জন্য প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ২১ জানুয়ারি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্পের জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের অবরাদ্দকৃত ৪৭৫ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে নিয়ে দরিদ্রদের তহবিল গঠনে কাজে লাগানো হবে। সভায় দেশের আরও ৪০ হাজার গ্রামে প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেজ গ্রহণেরও সিদ্ধান্ত হয়, যার আওতায় একইভাবে ৪০ হাজার গ্রামে স্থায়ী তহবিল গড়ে দেওয়া হবে। প্রকল্প পরিচালক ড. প্রশান্ত কুমার রায় আমাদের সময়কে জানান, সমিতির স্থায়ী তহবিল ক্রমে বাড়ছে। বর্তমানে ৪০ হাজার ৫২৭টি সমিতির প্রতিটির স্থায়ী তহবিল ১০ লাখ টাকার ওপরে। এ যাবৎ অনলাইনে ২০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৫টি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং মোট বিতরণকৃত অর্থের পরিমাণ ২৩ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। প্রতিটি ঋণ কোনো না কোনো কৃষিজ উৎপাদনমূলক কর্মকা-ে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকল্পের মধ্যবর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, ঋণ গ্রহণ করে যারা বিনিয়োগ করেছেন, তাদের বার্ষিক আয় গড়ে ১২ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানা যায়, ২০০৯ সালে প্রকল্পের শুরুতে উপকারভোগী দরিদ্রদের মধ্যে সম্পদ বিতরণে বৈষম্যের কারণে হুমকির মুখে পড়ে সরকারের সদিচ্ছা। প্রতি উপজেলায় ১০০ পরিবারকে ২০ হাজার টাকা মূল্যে গাভী বিতরণে সীমাহীন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়। সরকার সমর্থক দলের সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা প্রকৃত দরিদ্রদের জন্য দেওয়া নামমাত্র মূল্যের গাভী, হাঁস-মুরগির বাচ্চা, সবজি বীজ, গাছের চারা নিয়ে নেন। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় সারাদেশে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রকল্প দলিল সংশোধন করা হয়। পরে প্রকল্পের সম্পদ বিতরণ অংশটি বিলুপ্ত করে ক্ষুদ্র সঞ্চয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে ১ হাজার ৯৩২ ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৩৮৮টি গ্রামে ৬০ জন দরিদ্র মানুষ নিয়ে গঠন করা হয় গ্রাম উন্নয়ন সমিতি। নিয়ম করা হয়, প্রতি সদস্য মাসে ২০০ টাকা সঞ্চয় করলে প্রকল্প থেকে ২০০ টাকা উৎসাহ সঞ্চয় বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রকল্প দলিলে ত্রুটির কারণে সেবারও অতি দরিদ্র পরিবার এ প্রকল্পের সদস্য হতে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্টরাই সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করে প্রকল্পে দেশের সব উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে গ্রাম অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ২০১৩ সালে প্রকল্পটির দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন করে জুলাই ২০০৯-জুন ২০১৬ মেয়াদে ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে দরিদ্রদের সঞ্চয়ের বিপরীতে বোনাস হিসেবে দেওয়ার জন্য ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা এবং ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রামের গ্রাম উন্নয়ন সমিতিকে স্থায়ী ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা রাখা হয়। ২০১৩ সালেই প্রথম একটি নীতিমালা করা হয়। এতে প্রকল্পের সদস্য হিসেবে কাদের রাখা যাবে তাও নির্ধারণ করা হয়। এর সুফল পেতে শুরু করেছে দরিদ্র জনসাধারণ ও সরকার। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র সঞ্চয় মতবাদ দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করে। গড়ে উঠতে থাকে দরিদ্রদের নিজস্ব পুঁজি। এই পুঁজি অচিরেই হাজার কোটি টাকা স্পর্শ করতে যাচ্ছে।