বদলে যাওয়া বাংলাদেশ ॥ বিনিয়োগ করুন

গত সোমবার দু’দিনব্যাপী শীর্ষ বিনিয়োগ সম্মেলন ঢাকায় শেষ হয়েছে। এর ওপর বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত খবরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম। এক ফাঁকে দেখি বড় শিরোনামের একটি খবর। খবরটি চীনের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর। এক সময় খবর পড়তাম চীনে কিভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন (শত কোটি) ডলার বিনিয়োগ হিসেবে ঢুকছে। অবাক হয়ে এবার দেখছি উল্টো খবর। খবরটির শিরোনাম: ‘চীন পুঁজি পাচার করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ এতদিন খবর ছিল চীনে পুঁজি, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বন্যার স্রোতের মতো ঢুকছে। এখন চীনা নাগরিকরা ভীষণ দুশ্চিন্তায়। তাদের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর মূল্য বাজারে পড়ে যাচ্ছে। বিগত ২৫ বছরের মধ্যে চীনা প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন। শেয়ারবাজার পতনোন্মুখ। বিদেশীরা বিনিয়োগ প্রস্তাব বাতিল করে চীন ত্যাগ করছে। বিনিয়োগকারীরা পালাই পালাই করছে। প্রতিষ্ঠিত বিদেশী কোম্পানিগুলো তাদের অফিস গুটাচ্ছে। এতে চীনারা আতঙ্কিত। চীন চেষ্টা করেছিল তাদের মুদ্রা ‘ইউয়ান’কে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত করতে। তা হয়নি। এসব কারণে চীনারা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা-পয়সা নিয়ে চীন ত্যাগ করার পাঁয়তারা করছে। বোঝাই যাচ্ছে সুদিনে যারা ছিল দুর্দিনে তারা নেই। এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। দেখা যাচ্ছে অনেক দেশ থেকেই বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সেই অবস্থা আমাদের নেই। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতা বজায় আছে। অর্থনৈতিক সমস্ত সূচকই ইতিবাচক। এ প্রেক্ষাপটেই বিনিয়োগ সংক্রান্ত সম্মেলনটি হয়ে গেল। এর আয়োজক ছিল ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ (বিওআই) বিল্ড নামীয় একটি নতুন সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার কারণেই সম্মেলনটি সমধিক গুরুত্ব পায়। খবরে দেখা যাচ্ছে, সম্মেলনটি বেশ সাফল্যের সঙ্গেই সমাপ্ত হয়েছে। পনেরো দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার (আশি টাকা দরে এক লাখ ২১ হাজার ৬০০ কোটি) মূল্যের বিনিয়োগ প্রস্তাব এই সম্মেলনে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব দুটো এসেছে ভারত থেকে। সেই দেশের রিলায়েন্স পাওয়ার লিঃ এবং আদানি পাওয়ার লিমিটেড এগারো দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। তিন বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এসেছে দেশের বিদ্যুত কম্পানি ‘সামিট গ্রুপ’ থেকে। আর বাকি এক বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এসেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন’ (আইএফসি) থেকে। এসব প্রস্তাবই বিদ্যুত ও অবকাঠামো খাতে এসেছে। শীর্ষ সম্মেলনের এটা একটা সাফল্যের দিক। এছাড়া এই সম্মেলনে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। উন্নয়নের জন্যই বিনিয়োগ। কাজেই বিনিয়োগের বিভিন্ন দিক আলোচনা শেষে বেশকিছু সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে এবং এগুলো সমাধানের জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। যথারীতি সরকার পক্ষ থেকে যথেষ্ট আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে বাংলাদেশে এখনই বিনিয়োগ করার সময়। এখানে শ্রম সস্তা। আগামী কুড়ি বছর শ্রমশক্তির বয়স থাকবে সবচেয়ে কর্মক্ষম। বাংলাদেশে বিনিয়োগের নীতিমালা অন্য যে কোন দেশের চেয়ে কম উদার নয়। একের পর এক উদাহরণ টেনে আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ করে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে লোকসানের কোন সম্ভাবনা নেই। বিনিয়োগ করে টাকা অর্জন করতে পরিকল্পনা লাগবে না বরং টাকা লোকসান করতে পরিকল্পনা লাগবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন রূপান্তরের পালা চলছে। ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী মোস্তফা কামাল দেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, টাকা বিদেশে নিয়ে যাবেন না। দেশে বিনিয়োগ করুন। দেশের মানুষের সেবা করুন। আর না হয় ১০ বছর পর বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে না। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, টাকা দেশের বাইরে যাবে, আবার আসবে। টাকার এলাকা আছে। যেখানে স্বস্তি পাবে সেখানেই টাকা যাবে। পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই বিনিয়োগের প্রধান সমস্যাই আমরা চিহ্নিত করতে পারি। পরিকল্পনামন্ত্রী দেশী বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগ করতে অনুরোধ করছেন। স্পষ্টতই বোঝা যায় তারা দেশে বিনিয়োগ করতে কম উৎসাহী। তাদের অনেকেই যে দেশে টাকা রাখেন না সেই কথার ইঙ্গিতও মন্ত্রী মহোদয়ের কথা থেকে পাওয়া যায়। প্রশ্ন, দেশী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যদি নিজ দেশে বিনিয়োগ না করে ভিন দেশে টাকা নিয়ে যান, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কোন্্ দুঃখে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা হয় এককভাবে বিনিয়োগ করবে নতুবা দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মিলে বিনিয়োগ করবে। উভয় ক্ষেত্রেই তারা দেশী উদ্যোক্তাদের মতামত নেবে। শুধু সরকারের কথায় তারা বিশ্বাস করবে না। এমতাবস্থায় প্রধান অন্তরায়টা কী দাঁড়ায়? দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনীহা নয় কী? তার হাজার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু একথাও সত্য যে, দেশীয় উদ্যোক্তারা শুধু বিদেশে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে না। তারা সরকারের টাকা দিয়ে গাড়ি ও জমি কিনছেন। গত ২৬ জানুয়ারির একটি খবর থেকে আমরা জানতে পারলাম ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তরের জন্য সরকার ২৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এই টাকা নিয়ে অনেকে গাড়ি কিনেছেন, জমি কিনেছেন। ব্যবসার কাজে লাগাননি। এমনকি ব্যাংক ঋণের বিরাট অংশও ব্যবসায়ীদের একাংশ জমিতে বিনিয়োগ করেছেন এটা এখন সকলের জানা সত্য। দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই দেশের বাইরে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন, আবার দেশে থাকলে জমি কিনছেন, গাড়ি কিনছেন। এমতাবস্থায় কী দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে?

তবে কথা আছে। কারণ উপরের সমস্যাই একমাত্র সমস্যা নয়। দেশে টাকা বিনিয়োজিত না হয়ে তা যে বাইরে চলে যাচ্ছে এটা তো একদম বিনা কারণে নয়। আলোচ্য সম্মেলনে চিহ্নিত সমস্যাগুলো আলোচনা করলেই তা বোঝা যাবে। চিহ্নিত সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে : উচ্চসুদ, গ্যাস সঙ্কট, বিনিয়োগ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিরাজমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস না পাওয়া, উচ্চ কর হার, অবকাঠামোগত সমস্যা, জমির স্বল্পতা এবং বিনিয়োগকারীবান্ধব পরিবেশ না থাকা। সর্বাগ্রে উচ্চ ব্যাংক সুদ। এই অভিযোগের দায়ভাগ বর্তায় ব্যবসায়ীদের ওপরই। ব্যাংকিং খাতের ৮০ ভাগ ব্যবসা এখন বেসরকারী খাতে। ঐসব ব্যাংকের মালিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরাই। অতএব, এর সমাধান তাদেরই করা উচিত। এছাড়া রয়েছে সঞ্চয়কারীদের দিক। ঋণের ওপর সুদ কমাতে হলে আমানতের ওপর সুদ কমাতে হয়। কিন্তু আমানতকারীদের সঞ্চয় অভ্যাসও ঠিক রাখতে হবে। কাজেই সমস্যার দুটো দিকই বিবেচনায় আনতে হবে। অবশ্য ইতোমধ্যেই সুদের হার যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস না থাকা সম্পর্কে একটি কথা বলা দরকার। আমলাতন্ত্র একটি ‘নেসেসারি ইভিল’। আমলাতন্ত্র হয় সরকারী অফিসারদের হবে, না হয় পার্টির কর্মকর্তাদের হবে (সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে)। এর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া কঠিন। তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শুভেচ্ছা থাকলে এর কিছুটা সমাধান পাওয়া যেতে পারে। আমলারা কাজ করে আইন ও বিধিমালার অধীনে। এসব ভাঙলে তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। অতএব, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত আইন সংশোধন ও বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া। আইন ও বিধিমালা অপরিবর্তিত রেখে শুধু আমলাতন্ত্রকে দোষারোপ করলে হবে না। তবে এটাও ঠিক যে, বিনিয়োগকারীরা জানেন কিভাবে আমলাতন্ত্র মোকাবেলা করতে হয়। সত্যি সত্যি প্রকল্প লাভজনক হলে টাকাওয়ালারা জানেন কিভাবে আইন করিয়ে কাজ করতে হয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস থেকে সার্ভিস না পাওয়ার অভিযোগ আজকের নয়। বলা হয় ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ মানে ‘ডেড স্টপ’ এই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমাদের সমাধান বের করতে হবে। রাতারাতি এর সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন। উচ্চ কর হার। কর হার একটা কাঠামোর মধ্যে হয়। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তবে শিল্পায়নের জন্য কর হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার সব সময়ই সচেষ্ট থাকে। সরকারের আবার রাজস্ব প্রয়োজন আছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, সরকারের রাজস্ব চাহিদা এবং শিল্পায়নের দৃষ্টিতে কর হার নির্ধারণ করা কঠিন কিছু নয় বলে আমি মনে করি। অবকাঠামোগত সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার কিছু নেই। এই সমস্যাটি বহুল আলোচিত। এর সমাধানের পথ বাতলানো আছে। আমার ধারণা সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। জমির স্বল্পতা। এটি দিন দিনই প্রকট হবে। আমাদের জমি কম, মানুষ বেশি। এর মধ্যে আবার বড় বড় ব্যবসায়ী দেশের সর্বত্র হাজার হাজার বিঘা জমি কিনে খালি রেখে দিয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ১০০ অর্থনৈতিক জোন সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে কিছু হবে সরকারী। কিছু বেসরকারী। এক সময় শুনতাম ‘এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের’ কথা। এর কার্যকারিতা সম্ভবত ফুরিয়েছে। পাকিস্তান আমলে ছিল ‘বিসিক এস্টেট’- জেলায় জেলায়। সেসবের অবস্থা কী? তেজগাঁওয়ে করা হয়েছিল শিল্পাঞ্চল। তার অবস্থা কী? এসব বিবেচনায় নিয়ে এগুলো দরকার। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায় আমরা এক যুগসন্ধিক্ষণে। ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নেবেন বলেই আশা করা যায়।