যুদ্ধশিশু ও তাদের বিদেশী মা-বাবাদের প্রতি..

যুদ্ধশিশুদের কথা তেমন করে আমরা যারা ’৭১-এর অবরুদ্ধ বাংলাদেশে বাস করছিলাম, তারা কেন দীর্ঘকাল যাবত ভাবিনি, সে কথা ভেবে আজ বড় আফসোস হচ্ছে। সেই ’৭১-এ পাকিস্তানীদের বাঙালী নারী ধর্ষণের পরিণতি এই যুদ্ধশিশু। যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহণকারী বিদেশী মা-বাবাদের অপরিসীম ও অতুলনীয় স্নেহ-ভালবাসা এবং নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন লাভে সাহায্য করার কাহিনী জেনে শিহরিত হতে হয়। এ কাহিনী জানার সৌভাগ্য হয়েছে যে গবেষণাভিত্তিক বইটি পাঠ করে, সেটি হচ্ছে কানাডা প্রবাসী বাঙালী মুস্তফা চৌধুরী লিখিত ’৭১-এর যুদ্ধশিশু, অবিদিত ইতিহাস।’ বইটির প্রচ্ছদের ভেতরের পাতায় একদল যুদ্ধশিশুর ফটোগ্রাফ আমার হৃদয় ও বিবেককে কাঁপিয়ে তুলে। হৃদয় মথিত করা এই ছবি, দু-তিন মাস বয়সী একগুচ্ছ ফুলের মতো শিশুর ছবি- আমাকে মনে করিয়ে দিল ’৭১-এর ভুলে যাওয়া যুদ্ধশিশু ও তাদের আদর-স্নেহ দিয়ে মা-বাবার স্বাদ, যারা সেই পশ্চিমা দত্তক গ্রহীতা মা-বাবার কথা। আমার মাথা নত হয়ে গেল ওই বাবা-মাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় এবং গর্বে যুদ্ধশিশুদের অসীম সাহসের কথা ভেবে। বইটি নানা প্রয়োজনীয় তথ্য-সাক্ষ্য-প্রমাণ সংযোজনের জন্য ভারি এবং সে জন্য মূল্যও বেশি। কিন্তু তা না ভেবেই বইটি কিনে নিলাম, তার আগেই গত বছরের ফেব্রুয়ারির বইমেলায় জঙ্গীদের হাতে নিহত অভিজিত রায়ের বই ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে’ বইটিসহ বেশ কটি বই কেনা হয়েছে! সাধারণত অন্যান্য খরচ সংক্ষিপ্ত করে বই কেনার জন্য মুক্তহস্তই হই। বইগুলো থেকে সবশেষে পড়ব বলে যুদ্ধশিশুদের ওপর লেখা বইটি রাখা ছিল। বইটি মাত্র পড়তে শুরু করেছি; কিন্তু বার বার ভেতরের প্রচ্ছদের অনিন্দ্যসুন্দর নিষ্পাপ শিশুদের ছবিটি দেখছিলাম! ছবিতে গুনে দেখলাম মোট একুশজন যুদ্ধশিশু রয়েছে! ভাবছিলাম- কেন বঙ্গবন্ধু, তাঁর সরকার ছাড়া আর সবাই, আমরা সে সময়ে নতুন মা, ভুলে গেলাম যে একটি যুদ্ধে যখন ধর্ষণ ছিল প্রাত্যহিক, তখন যুদ্ধশেষে হাজার হাজর যুদ্ধশিশুর জন্ম হওয়া স্বাভাবিক ছিল না কি? আমরা সদ্য মা হয়ে ছোট ছোট শিশু নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে এক কঠিন বাস্তবতার (‘যুদ্ধ ও আমি’- বইতে লিখেছি) মধ্যে সংসার এবং ’৭২-এর সেপ্টেম্বরে সরকারী চাকরিতে প্রবেশ করেছি। আশপাশে কঠিন জীবনযাপন করছিল সব শহীদ শিক্ষকদের স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা, এসবকিছুর মধ্যে যুদ্ধাপরাধী দালাল রাজাকারদের বিচারই ছিল মাথায়। ভুলে ছিলাম যুদ্ধশিশুদের কথা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভোলেননি। তিনি ধর্ষিতাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দেন, তাদের পুনর্বাসনের কাজ করেন, গর্ভবতীদের গর্ভপাত, শিশুর জন্মদান ও এসব যুদ্ধশিশুকে বিদেশে দত্তক গ্রহণের ব্যবস্থাও করেন। বীরাঙ্গনাদের এক সময় বলেছিলেন, কোন কাগজে বাবার নাম দিতে সমস্যা হলে, সবাই বাবার নাম দেবে শেখ মুজিবুর রহমান! পৃথিবীতে এমন তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত আশার আশ্বাস আর কোন দেশের কোন নেতা দিয়েছেন বলে শুনিনি! বাঙালী বুদ্ধিজীবী সেই শিশু বাংলাদেশকে যেমন উপযুক্ত সেবা-যতœ দেননি, তেমনি নতুন সরকারকে যথার্থ সহায়তাও দেননি; বরং বাংলাদেশের জন্মের শত্রুরা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের, সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যে বিষোদগার, তিলকে তাল করার মতো প্রচার, প্রপাগান্ডা চালাচ্ছিল সেসব দ্বারা অনেকেই প্রভাবিত হচ্ছিল- আজ সে সব বিষয় মনে পড়ে। ’৭৪-এর কোন এক সময় দীর্ঘকায় সুদর্শন শেখ কামাল আমার বাবা আবুল ফজলকে বিমানবন্দর থেকে আমাদের বাসায় বাবার স্যুটকেস হাতে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল! আজ মনে হচ্ছে, কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সাংসদ পুত্র এভাবে কোন সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানাবে না! যে তরুণ সেতার বাজায়, ফুটবল-ক্রিকেট খেলাধুলার চর্চায় মগ্ন থাকে সে কি কখনও বেপথু হতে পারে? আমিই তো মানবিক মানুষ হওয়ার জন্য শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতি চর্চা ও স্কুল-কলেজে খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টির পক্ষে। তরুণদের মন থেকে জঙ্গী জিহাদী চিন্তা-ধারণা নির্মূলেও দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা ও খেলাধুলাকে প্রমোট করার সুপারিশ করি।

১৯৯২ সালে শহীদ রুমীর মা বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ’৭১-এর ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। সেবার ’৭১-এর অন্যতম ঘাতক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল ও বিচারের দাবিতে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে বন্ধু, পরিবারসহ উপস্থিত হয়েছিলাম। ওই গৌরবময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সে সময় পেয়েছিলাম পথচলার দিশা! প্রকৃত ইতিহাস যা ’৭৬ থেকে ’৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালে ধূলিধূসরিত, অব্যাহত মিথ্যা প্রচারের মুখোশে ঢাকা পড়ে যাওয়া অন্ধকার ছায়া মানুষ ও তাঁদের কীর্তিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হবে আমার জীবনের লক্ষ্য।

ইতিহাসের সত্য সন্ধানের পথে নামা অসংখ্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকা যুদ্ধশিশু ও তাদের বিদেশী মা-বাবাদের সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন একটি অসামান্য কাজ। বাঙালী সমাজে প্রচলিত নারী, পুরুষ, শিশুর প্রতি অবমাননাকর হাজারো সংস্কারের যাঁতাকলে পড়ে এই শিশুরা সমস্যায় পড়ত। লেখক তা সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন। এ রকম সামাজিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধশিশুদের বিদেশে দত্তক প্রদানের ব্যবস্থা করে লাখ লাখ ধর্ষিত নারীর সামাজিক সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে মনে করেই এ লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে ‘এবোরশন আইন’ ও ‘দত্তক আইন’ পাস করেন। বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে যুদ্ধশিশুদের সুস্থ সামাজিক, পারিবারিক পরিবেশ বিদেশেই সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। যেটি একটি অসাধারণ নেতার দূরদৃষ্টি ও বাস্তব পদক্ষেপের প্রমাণ! এই যুদ্ধশিশুদের জাতির স্মরণ করা যেমন দরকার, তেমনি তাদের দত্তক গ্রহণ করে বাঙালী জাতিকে চির ঋণী করেছে যারা সেই বিদেশী বাবা মায়েদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা চিরদিন। কিভাবে সেই ’৭১ সালে অত দূর দেশ কানাডা থেকে অন্তত পনেরো জোড়া তরুণ দম্পতি এই আমাদেরই দেশের পনেরোজন যুদ্ধশিশুকে দত্তক গ্রহণ করে। এ জন্য তাদের দেশের প্রাদেশিক আইনকে পরিবর্তন করে এই ঠিকানাবিহীন শিশুদের পরিবার দিতে, স্নেহ, ভালবাসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সুস্থ বিকাশের সুযোগ দিতে এগিয়ে এসেছিল। তাদের এই অসীম করুণাময় বদান্যতাকে সেল্যুট জানাই। যা আমি বা আমরা পারিনি, তা বঙ্গবন্ধু ঠিকই ভেবেছিলেন, হয়ত আমাদের বাঙালী পরিবারে, সমাজে, স্কুলে, কর্মস্থলে এই যুদ্ধশিশুরা স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বেড়ে উঠতে সমস্যার মুখে পড়ত! নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে জীবনযাপন একজন বয়স্কের পক্ষে কিছুটা সম্ভবপর হলেও ছোট অবোধ শিশুর পক্ষে সমাজের বিরুদ্ধতা অগ্রাহ্য করে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। লেখক এ কথা বারংবার বলেছেন যে, বাঙালী পুরুষ কর্তৃত্বের সংস্কৃতিতে ধর্ষণের জন্য দায়ী পুরুষটিকে সমাজ দোষী করে না, দোষী করা হয় ধর্ষিতা বালিকা বা তরুণীকে! শুধু বাংলাদেশে নয়, মুসলিম প্রধান সব দেশে এবং প্রাচ্য দেশের সব সংস্কৃতিতে ধর্ষণের জন্য পুরুষকে দায়ী করা হয় না! অথচ পুরুষ বিচারক ভাল করেই জানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে পুরুষ! এই সংস্কৃতিতে ধর্ষণের ফল-শিশুর অবস্থান ও অবস্থা কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়! বইটি পড়তে পড়তে মনে প্রশ্ন জাগছিল- আমরা অনাথ শিশুদের দত্তক গ্রহণ করি না কেন? আসলে যে পরিবারের নিজ কন্যা বা বধূ যুদ্ধে ধর্ষিতা হয়েছে, তারা আমার কন্যা হলেও বা আমি ধর্ষিতা হলেও আমার প্রথম কাজ হতো, কোনক্রমে ‘এ্যাবরশন’ করানো। এরপর সেটি সম্ভব না হলে যদি শত্রুর ঔরসে শিশু জন্ম নিত, তাহলে আমি বা আমরা কি করতাম? একদিকে নিজের গর্ভজাত শিশু যে শত্রু, মিত্র, বিবাহ, ধর্ষণ, ন্যায়, অন্যায় কিছুই জানে না এবং সে নিজে কোন অন্যায় করেনি, আবার অন্যদিকে শিশুটি জবরদস্তিমূলক শত্রুর হাতে ধর্ষিতা হওয়ার ফলে জন্ম গ্রহণ করেছে, এ দুই দোলাচলে এ দেশীয় সমাজে প্রতিক্রিয়া কি হতো? শিশুর জন্মদাতা যেহেতু শত্রু, সেহেতু শিশুটি নিষ্পাপ হয়েও তার বাস্তবতা কিন্তু অধিকাংশ মায়ের কাছে কাক্সিক্ষত হতো না- এটিই ট্র্যাজেডি।

৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর পর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা, নির্যাতিতা নারীদের ‘শত্রুর ভ্রƒণ’ মোচনই ছিল স্বাভাবিক। ধর্ষিতা কন্যাদের সমাজে পুনর্বাসিত করার দুশ্চিন্তায় তাদের বাবা-মা স্বভাবতই ছিল উদ্বিগ্ন। আমার মনে পড়ে, আমরা ‘নির্মূল কমিটি’ থেকে ৭-৮ জন বীরাঙ্গনা দরিদ্র নারীকে অর্থ সাহায্য করেছি সম্ভবত ২০০৬/৭-এর দিকে। দরিদ্র ‘বীরাঙ্গনা’ নারীদের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনার সূচনা হয়েছে বেশ দেরিতে, ‘গণআদালত’ অনুষ্ঠিত হওয়ারও কমপক্ষে এক দশক পর। বীরাঙ্গনাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ গণ্য করার দাবি উঠেছে খুবই সাম্প্রতিক এবং তাদেরও মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ভাতা ও সরকারী সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে এই ক’মাস হলো। যুদ্ধশিশুদের নিয়ে বাঙালী জাতির একটি আগ্রহ ও কৌতূহল, বিশেষ করে তারা কে, কোথায়, কিভাবে আছে, সেই তথ্য জানার চেষ্টা একেবারেই দেখা যায়নি। কয়েক বছর আগে কানাডা থেকে বনি কাপুচিনো তাঁর দুই বর্ণের দু’সন্তানসহ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এলে তাঁর মুখে যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য জানতে পারি এবং যুদ্ধশিশুদের বিষয়ে কৌতূহলী হই। যে কৌতূহল পূরণ করলেন সংবেদনশীল প্রবাসী লেখক মুস্তফা চৌধুরী তার বিরল আগ্রহ, কৌতূহল এবং স্বদেশের জন্ম ও একইভাবে একই সময়ে যুদ্ধশিশুদের জন্মের ঐতিহাসিক জটিল বন্ধন উন্মোচন করে। দুটি দেশের মধ্যে চূড়ান্ত বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও বাঙালী মায়ের নিষ্পাপ শিশু ও শিশুর দত্তক গ্রহণকারী পশ্চিমা মা-বাবার কাহিনী প্রকাশের মাধ্যমে একটি অলিখিত অদৃষ্টপূর্ব চিরন্তন মানবিক আবেগের জন্ম দিয়েছে এই গবেষণা গ্রন্থ। সব ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহত্যা, হত্যার ওপরে এটি ভালবাসার জয়ধ্বজাকে তুলে ধরেছে! আমাদের অক্ষমতাকে ওরা ক্ষমা করে দিয়েছে এবং সত্যিই আমাদের যুদ্ধশিশুরা ওদের দত্তক গ্রহীতা মা, বাবা, ভাই, বোনদের সাহায্যে ওই পশ্চিমা দেশের উদার পরিবেশে সুস্থ, সফল জীবন লাভ করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিজয়কে, বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতাকে, সর্বোপরি যুদ্ধশিশুদের নিজেদের বিজয়ী করেছে! পাকিস্তানী সেনাদের বিচারের প্রধান ও মূল্যবান সাক্ষী তো এই যুদ্ধশিশুরা! যুদ্ধশিশু, দত্তক গ্রহীতা মা, বাবা, লেখক- সবাইকে অভিনন্দন। সেইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়, সর্বোপরি জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলব, যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহীতা মা-বাবাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে জাতিকে সম্মানিত করুন।