বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় এখন বাংলাদেশই সেরা

বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। যে কোন সময়ের চাইতে এ দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার ১৭০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের হাতছানি দিচ্ছে।

সোমবার বিনিয়োগ বোর্ড আয়োজিত ‘ইনভেস্টমেন্ট এন্ড পলিসি’ সামিটে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই সামিটে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে- বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শুধু সব ধরনের সহযোগিতাই দেয়া হবে না আগামী ১০ বছরের জন্য শুল্ক সুবিধা দেয়া হবে। সামিটের দ্বিতীয় দিনেও উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আরও ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মানিগার্ড গ্রুপের পরিচালক নাজিবুর রাহিম দেশের ব্যাংকিং খাতের এটিএম সার্ভিসের সেবার মান বাড়াতে কয়েক ধাপে এই অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশেই এটিএম বুথের যাবতীয় সরঞ্জাম বাংলাদেশে উৎপাদন করবেন।

এছাড়া বিদেশী উদ্যোক্তারা দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নেও বিনিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুত, জ্বালানি, গ্যাস, কয়লা উত্তোলন এবং পেট্রোলিয়াম খাতে বিনিয়োগে বিদেশীরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, সামিটের প্রথম দিনে ভারতের রিলায়েন্স, আদানী এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এদেশে ১২শ’ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে-বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বাড়াতে ইতোমধ্যে কিছু ভাল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিছু পলিসি রিফর্ম করা হয়েছে। এতে এ দেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে ভাল সম্পর্ক বিরাজ করছে। এতে আন্তঃবাণিজ্যে বাংলাদেশ আগামীতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশের এসব পদক্ষেপে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ সন্তুষ্ট। তাই এদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

তবে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ বোর্ডকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা রফতানি উন্নয়ন ব্যুরা (ইপিবি), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ(বেজা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও বিদ্যুত বিভাগসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের জন্য এখন বাংলাদেশই সেরা। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রফতানিতে বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। তাই বিদেশী উদ্যোক্তারা এদেশে বিনিয়োগ করে শুল্ক সুবিধা নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনীদেশগুলোতে রফতানি করে লাভবান হতে পারেন। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায়ও ১৭০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। এই সুবিধা বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিতে পারেন।

সামিটের দ্বিতীয় দিনে পলিসি ফর ইনভেস্ট বিষয়ক ৫টি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশগ্রহণ করেছেন পরিককল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মুনসুর, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিয়ার আলম, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ এ সামাদ, এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট) ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন, এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হোসেন খালেদ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট পলিসি বিশেষজ্ঞ রবার্টো চান্ডি, মিস ছিলি ফ্রম্যান, বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র ম-ল, আইসিবির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এস এম মাহফুজুর রহমান, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার আরিফ খান, সিঙ্গাপুরের আইএফসি এ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান এ্যাডম স্যাক, বিডি ভেঞ্চার প্রধান সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের প্র্যাকটিস ম্যানেজার ইসপারাঞ্জা লাসাগাস্টার, রিয়ার এ্যাডমিরাল (অব) খোরশেদ আলম, ঢাকায় নিযুক্ত জাপানী রাষ্ট্রদূত মাসাতু ওয়াতানাবি, জেট্রো প্রতিনিধি কেই কাওনো, বাংলাদেশ হোন্ডার সিইও ইয়োচি মিজুটানি, আইএফসি জাপানের প্রতিনিধি হিরোচি জিনো প্রমুখ।

সেমিনারে অংশ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের প্রতিনিধি ইসপারাঞ্জা লাসাগাস্টার বলেন, সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপের ফলে এদেশে এখন বিনিয়োগ পরিবেশ বিরাজ করছে। বিনিয়োগ বোর্ড শক্তিশালী করাসহ অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু রিফর্ম করা হয়েছে। তবে আগামীতেও রিফর্ম প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ সর্বদা তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, চলতি মাসের মধ্যে সরকার আরও ১০টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে যাচ্ছে। এছাড়া বিনিয়োগ বোর্ডের ওয়ানস্টপ সার্ভিস কার্যক্রম পুরোমাত্রায় শুরু হবে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি একটি বড় বিষয়। ইতোমধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনে সরকার বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এছাড়া ১২ বিলিয়ন ডলারের যে বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেল সেখানে ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে বিদ্যুত খাত উন্নয়নে। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার শুল্ক সুবিধা ঘোষণা করেছে। এসব কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ইতোমধ্যে দেশের সরকারী ও বেসরকারী খাতের ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন একটি বড় বিষয়। এ ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে সুদহার কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতেও ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, বিপুলসংখ্যক বিদেশী বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণই বলে দিচ্ছে এবারের বিনিয়োগ সম্মেলন সফল হয়েছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য বড় বিষয় বিদ্যুত। সেই বিদ্যুত এখন সহজে পাওয়া যাচ্ছে। তাই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, ভারতের বড় শিল্প গ্রুপ রিলায়েন্স এবং আদানী বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাদের এই প্রতিশ্রুতির ফলে বিশ্বের অনেক দেশের বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এদেশে বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখছেন। আশা করছি, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হবে।

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে যে মোটর ভেহিক্যাল চুক্তি হয়েছে তা এখন কার্যকর করতে হবে। এটি কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তঃবাণিজ্য বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, দেশে এখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে।

রিয়ার এ্যাডমিরাল (অব) খোরশেদ আলম বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় এদেশে ব্লু ইকোনমির উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুমদ্র অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ব্লু ইকোনমিতে আগ্রহ বাড়ছে।

বারো শ’ কোটি ডলার বিনিয়োগ বাস্তবায়নে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে ॥ বারো শ’ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। আশা করছি, বাংলাদেশে আগামীতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে।

সোমবার দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট পলিসি সামিট’ সমাপ্তি ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এই সম্মেলনের অর্জন এবং এ থেকে কি পেল বাংলাদেশ-সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, টাকায় টাকা আনে তাই যে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে সেটি এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন জরুরী হয়ে পড়ছে। সরকার প্রতিশ্রুত এই বিনিয়োগ আনতে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে টাকা লোকসানের সুযোগ নেই। বাংলাদেশে বিনিয়োগের এখনই সুযোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের একটি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় থাকে। বাংলাদেশ এখন সেই সময়ে অবস্থান করছে। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর হবে বাংলাদেশ।

তিনি দেশী বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্লিজ বিদেশে টাকা নিয়ে যাবেন না। দেশে বিনিয়োগ করুন। দেশের মানুষের সেবা করুন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান এম এ সামাদ, এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদ, ডিসিসিআই সভাপতি হোসেন খালেদ, বিল্ডের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম প্রমুখ।