অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ব্যাপক

কর্মক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে নারীদের অংশগ্রহণ। শুধু কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতিতিই নয়, প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবেও মহিলাদের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নারী-পুরষের বৈষম হ্রাস, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাধান্য, মানুষের মধ্যে সচেতনা, শিক্ষার হার বৃদ্ধি

এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি দিন দিন অর্থনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত হচ্ছেন নারীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে এ চিত্র। যদিও বিশ্বব্যাংক বলছে বাংলাদেশে নারীরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। এটা অফিসিয়াল কিংবা অন্য যে কোন পেশাতেই বিদ্যমান। কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ জরিপের ফল বলছে অন্য কথা।

সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০১ এবং ০৩ সালে বাংলাদেশে মোট নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ২৯ হাজার ৪১৩ । যা মোট শ্রমিকের দশ দশমিক ৯১ শতাংশ। সেটি বেড়ে গিয়ে ২০১৩ সালে পরিচালিত শুমারিতে দেখা গেছে ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮, যা মোট শ্রমিকের ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা, এনডিসি জনকণ্ঠকে বলেন, নারীরা এগিয়ে চলছে, তবে এ চলার পথ মসৃণ নয়, নানা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আমরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে এদেশের নারীদের। তারপরও অদম্য নারীরা থেমে যায় না। এগিয়ে চলে সামনের পথে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সূত্র জানায়, সরকার নারীদের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে শুরু থেকেই নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যেই ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় নারীবান্ধব কর্মসূচী বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমানে বাস্তবায়িত হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনায় জেন্ডার ভিশনে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন দেশ যেখানে নারী ও পুরুষের সমান সুযোগ ও অধিকার থাকবে এবং যেখানে নারীরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে সমান অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত হবে। পরিকল্পনায় নারীর ক্ষমতায়নে ও জেন্ডার সমতা নির্ধারণে চারটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে প্রথমত, নারীর সামর্থ্য উন্নীতকরণ; দ্বিতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ; তৃতীয়ত, নারীর মত প্রকাশ ও মতামত প্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারীর উন্নয়নে একটি সক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিকরণ।

এ বিষয়ে জিইডির সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিস্তৃতি ঘটেছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, জনযোগাযোগ, বিদ্যুত সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মোপযোগী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এটিই হচ্ছে বড় কথা। সরকার এ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছে বলেই নারীরা এগিয়ে যেতে পারছে। তাছাড়া বেসরকারী উদ্যোক্তাদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে মহিলাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ শুমারির সময় ২০১৩ সালে দেশে মোট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মহিলা প্রধান প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬৮টি, যা মোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৭ দশমিক ২১ শতাংশ। ২০০১ এবং ২০০৩ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৩ হাজার ৮৫৮টি, যা মোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। এতে দেখা যাচ্ছে এক দশকে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে মহিলাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর আগে বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, অসহায়, অবহেলিত ও প্রতিবন্ধী নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, আত্মকর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র ঋণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জেন্ডার সংবেদনশীল আইনী কাঠামো, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের ফলে নারীরা ধীরে ধীরে দেশের আর্ত-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছেন। তিনি জানান, কর্মরত নারীর সংখ্যা ২০০৬ সালে ছিল ১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন, ২০১৩ সালে তা ১৬ দশমিক ৮ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। নারী সমাজের শ্রম, মেধা ও মননকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সূত্র জানায়, লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। দি গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুসারে ২০১৪ সালে ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম। শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের পিছনে। এছাড়া নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নেও বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২টি দেশের মধ্যে দশম।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইতোমধ্যেই নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এবার পাঁচটি ক্ষেত্রে নিজস্ব কায়দায় বাংলাদেশ ব্যাপক উন্নতি করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এগুলো হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ, দুর্যোগ মোববেলা, শহর ও গ্রামের মধ্যে সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ^ব্যাংকের সিস্টেমেটিক কান্ট্রি ডায়গনস্টিক প্রতিবেদনে এ বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ^ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ পাঁচটি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করার কারণে মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) হিসেবে, ১৯৭২ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ১০০ ডলারের নিচে ছিল, সেটি বর্তমানে ১ হাজার ৩১৪ ডলার। প্রথমত, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালে যেখানে প্রতিজন নারী ছয় জন সন্তান জš§ দিত, সেটি কমে দুই জনে নেমে এসেছে। দ্বিতীয়ত, কৃষিক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগে আশির দশকে যেখানে ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো, সেটি বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। তৃতীয়ত, দুর্যোগ মোকাবেলায় বেশ ভাল ব্যবস্থাপনার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা, দুর্যোগে ক্ষতি হ্রাস, পূর্বাভাস এবং প্রচুর আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। চতুর্থত, শহর ও গ্রামের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে রাস্তা নির্মাণ করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, অন্যান্য শহর এবং বাজারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগে শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমেছে। সর্বশেষ লিঙ্গ সমতা এবং নারী ক্ষমতায়নে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কারণে নারী শিক্ষা, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) এবং তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের নারী ব্যবসা ও আইন-২০১৬ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের নারীরা এখনও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। প্রতি দু’বছর অন্তর এ প্রতিবেদন তৈরি করে সংস্থাটি। বিশ্বের ১৭৩টি দেশে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় নারী কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষ বৈষম্যের কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়াতে নারীকে চাকরি উদ্যোক্তা হতে সবচেয়ে বাধার সম্মুখীন (নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা) হতে হয়। অথচ এ অঞ্চলে সংস্কার কার্যক্রমের পিছিয়ে রয়েছে। এতে বলা হয়, এ অঞ্চলে নারীর প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে গত দু’বছরে মাত্র তিনটি সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তানের নারীরা সবচেয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক বা বাধার সম্মুখীন হন। যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হতে ২০টির বেশি আইনী বাধা রয়েছে। যেখানে নারী-পুরুষ এক সঙ্গে কাজ করতে পারেন না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬১ কোটি ২০ লাখ নারীর বিরাট অর্থনৈতিক দেশটির ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। দেশটিতে বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে নারীর কাজের প্রতিবন্ধকতা ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশটিতে নারী সুরক্ষায় প্রকাশ্যে নারীকে যৌন নিপীড়নের আইন আছে। যা বিশ্বের অন্যান্য উদীয়মান ১৮টি দেশেরও একই রকম আইন বিদ্যমান।

গত দু’বছরে ভারতে নারীদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্তা বাড়াতে বেশকিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে পাবলিক লিস্টেট কম্পোনিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে একজন নারী রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাকিস্তানে নারীদের প্রতিবন্ধকতা ব্যাপক। কোন নারীকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন পেতে হলে স্বামীর নাম, জাতীয়তা এবং ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হয়। যার জন্য নারীদের স্বাক্ষীও উপস্থিত করতে হয়। তবে পাকিস্তানে গত দু’বছরে বেশকিছু সংস্কার আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কার বিষয়ে বলা হয়, মহিলা শ্রম শক্তিতে প্রভাব পড়ে এমন আইন দেশটির রয়েছে। যে আইন বৈষম্যের সৃষ্টি করে। দেশটিকে কয়লার খনিতে নারী কর্মীদের কাজের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ড. শামসুল আলম জানান, ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এসব পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা এবং দারিদ্র্যের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান সরকার পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার পর ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছে। সরকারের পূর্ব ও বর্তমান মেয়াদকালে দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়কালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝেও অর্জিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি প্রশংসার দাবি রাখে। সরকারের দক্ষ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ফলে রাজস্ব আহরণে উর্ধগতি এবং ঋণ গ্রহণে স্থিতিশীলতা রজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রতিবেশী ও সমমানের রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অভূতপূর্ব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশেল ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।