নীলনকশার ফাঁদে দেশ

এসব রাষ্ট্রদ্রোহমূলক সন্ত্রাসী ঘটনার আড়ালে যা লুকিয়ে আছে, তা হলো সরকারকে বিপদগ্রস্ত করে, তার চলার পথ কণ্টকিত করা। বোধ করি সরকারের আত্মশ্লাঘার কোনো পথ খোলা নেই। আত্মতৃপ্তির স্রোতে গা ভাসালে সর্বনাশ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে, এটা মেনে সতর্ক থাকতে হবে।
মাহমুদুল বাসার
তিনটি ঘটনা লক্ষ্য করার মতো। নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের লাগাতার আন্দোলন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের তা-ব এবং মানিকগঞ্জে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে চারজনকে হত্যার হুমকি দিয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।
বেতন দ্বিগুণ বাড়ানোর পরও এ ধরনের কঠোর আন্দোলনে নামার যৌক্তিকতা শিক্ষক ও সরকার উভয় পক্ষকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। শিক্ষকদের প্রতি স্বয়ং বঙ্গবন্ধু সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তিনিই প্রথম প্রাইমারি শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। ‘বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-৭৩’ প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিলেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাইমারির ছাত্রছাত্রীদের সরকারি অনুদানে বই তুলে দেয়ার কাজটি বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। সেই মহৎ কাজটি অনেক দূর প্রসারিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কলেজ লেভেল পর্যন্ত তিনি মেয়েদের শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছেন, ঢালাও উপবৃত্তি প্রদান করেছেন। একই বছর ২৬ লাখ বই তুলে দিয়েছেন। শিক্ষাঙ্গনে কুসংস্কারের পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রাধান্য দিয়েছেন। কম্পিউটার সাপ্লাই দিয়েছেন, বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে উৎসাহ দিয়েছেন। শিক্ষাকে মোটামুটি ডিজিটালাইজড করেছেন। এর পরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকরা শিক্ষার সামগ্রিক অগ্রগতির ফলাফলের কথা বিবেচনা না করে শুধু নিজেদের বেতন বৃদ্ধির আরো সুবিধার লক্ষ্যে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের বেতন অষ্টম পে-স্কেলের আওতায় দ্বিগুণ করেছেন। তার পরও এই কঠোর আন্দোলন কেন? প্রধানমন্ত্রীকে বেকায়দায় ফেলবার জন্য? এতে প্রধানমন্ত্রী বিস্মিত ও ব্যথিত হয়েছেন। তিনি বিষয়টির সুরাহা করার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, শিক্ষকরা যেন ক্লাসে ফিরে যান। শিক্ষকরা কর্ণপাত করেননি প্রধানমন্ত্রীর কথায়।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, এত বেতন বাড়ানোর পরও অসন্তোষ কেন? সচিব হতে চাইলে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সচিব হয়ে যান।
প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষোভ ভিত্তিহীন নয়। যোগ্যতার মাপকাঠিতে বেতন কাঠামো নির্ধারিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিসিএস পরীক্ষায় পাস করে মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্রছাত্রীরা যোগ্যতার মূল্য না পেলে সারা দেশের প্রশাসনে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। চাকরিতে মেধাবীরা মূল্য না পেলে দেশে মেধাশূন্যতা দেখা দেবে। শিক্ষকরা ৬৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করার সুযোগ পাবেন আর সচিবরা ৫৯ বছরে চাকরি ত্যাগ করে পেনশনে যাবেন। এই বাড়তি সুবিধারও মূল্য দেননি শিক্ষকরা। তবুও আমাদের অনুরোধ, সরকারের নীতিনির্ধারকরা যেন বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিষয়টির দ্রুত সুরাহা করেন। না হলে পরিস্থিতি অপরাজনীতির দিকে গড়াবে। বিএনপি-জামায়াত পানি ঘোলা করার জন্য ওত পেতে আছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি সাধারণ ঘটনা নয়। না হলে তর্ক লেগেছে একজন ৮৫ বছরের বয়স্ক ইজিবাইক চালকের সঙ্গে, মীমাংসা করতে গিয়েছিলেন একজন ব্যবসায়ী। এরপর তর্কের উত্তাপ সন্ত্রাসী হামলায় প্রসারিত হয়। মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের অসহিষ্ণুতা সর্বজনবিদিত। তা-ব চালাতে তারা ওস্তাদ। ওত পেতে থাকে খঞ্জর হাতে নিয়ে; অজুহাত পেলেই মানুষের গর্দানে বসিয়ে দেবে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে। সহনশীলতার চর্চা তো মাদ্রাসায় নেই। তর্কের জের এতদূর পেঁৗছাতে পারে নাকি যে, মার্কেট আক্রমণ করা হলো, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীত বিদ্যালয় তছনছ করা হলো, তার মতো মহৎ শিল্পীর ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র বিচূর্ণ করা হলো, ভাষাসৈনিক ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে’ তা-ব চালানো হলো। নৈরাজ্য এখানেও থেমে নেই। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়ি আক্রমণ করা হয়েছে। রেললাইনের প্লেট তুলে ফেলা হয়েছে। দোকানপাট ভাংচুর করা হয়েছে।
এ তা-বের ভেতর দিয়ে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মোটিভ উন্মোচিত হয়েছে। তারা একদিকে সরকারবিরোধী অন্যদিকে সংস্কৃতিবিরোধী। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে আচরণ করেছে তাতে ৫ জানুয়ারি থেকে ৯৩ দিন পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের তা-বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। রেললাইনের প্লেট তুলে ফেলে সেখানে গাছের গুঁড়ি ফেলার অর্থ কী? ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। রেললাইনের ওপর গাছ ফেলে গাছের গুঁড়িতে আগুনও লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই তা-ব থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, সরকারের বিরুদ্ধে এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ক্ষোভ জমাট বেঁধেছে। সরকারের সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি হজম করতে পারছে না মাদ্রাসাগুলো। এমনিতে সেখানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাওয়া হয় না। মাদ্রাসায় কোনো ধরনের সংস্কৃতিচর্চা নেই। জামায়াত-শিবিরের প্রধান আখড়া হচ্ছে মাদ্রাসা।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনের পর জামায়াত-শিবির ও জেএমবির সন্ত্রাসীরা ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা নিক্ষেপ করেছিল। তার দায় চাপিয়ে দিয়েছিল অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের ওপর। যাত্রার প্যান্ডেলে আগুন দিয়েছিল সন্ত্রাসী ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা, উদীচীর অনুষ্ঠানে, পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিল। কেন? এসব নাকি হারাম। তা পাক জেনারেলরা যে বোতল বোতল মদপান করেন, ১৯৭১ সালে নারী ধর্ষণ করেছিলেন, সেসব হারাম ছিল না? পাকিস্তানেও তো সিনেমা হল আছে। নায়ক-নায়িকা আছে। কোকিলকণ্ঠী নুরজাহানের গানের, অভিনয়ের ও রূপের প্রশংসা করেছেন উর্দু কথাশিল্পী সাদাত হাসান মান্টো। তার ‘ঠান্ডা গোস্ত’ গল্প পড়লে রক্ত ঠা-া হয়ে যাবে।
সরকারকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তা-ব থেকে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মাদ্রাসাগুলো ওত পেতে আছে সরকারের বিরুদ্ধে। অজুহাত পাওয়ামাত্র মারমার কাটকাট করে কিরিচ, কুড়াল, বোমা নিয়ে বের হয়ে পড়বে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তাল মেলাতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তা-বের যথার্থ তদন্ত হওয়া উচিত। তা-ব সৃষ্টিকারীদের বিষদাঁত ভেঙে ফেলা উচিত।
দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাদ্রাসাশিক্ষকদের সরকারি অনুদানভুক্ত করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় মাদ্রাসাশিক্ষকদের রেশনিং সিস্টেমের আওতায় এনেছিলেন। যাতে মাদ্রাসাশিক্ষকরা সস্তায় খাদ্য কিনতে পারেন। এর প্রতিদান কিভাবে পেলেন তিনি? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে তাকে ইসলামের এক নাম্বার শত্রু বানানো হলো। পাকিস্তানের আইয়ুব খান আব্বাজান লন্ডনে কন্যার বয়সী নায়িকার সঙ্গে উলঙ্গ হয়ে সুইমিং করেছেন, সে খবর নিশ্চয়ই রাখেন তেঁতুল হুজুররা। মওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব ইসলামের ক্ষতি করেননি।’
তৃতীয় ঘটনা : ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বোলখাল বাজারে ৮৫ বছরের ছমির আলী ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হয়েছিলেন। এ অপরাধে দুই শিবির ক্যাডার ওই জইফ বৃদ্ধের বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পাকিস্তানি জেনারেলদের মতো বাংলাদেশকে বিধর্মীমুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে জামায়াত-শিবিরের। আমরা তা-ই লক্ষ্য করছি দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো জামায়াতের পরিকল্পনার ছক অনুসারে বিদেশি-ভিন্নধর্মী নাগরিকদের হত্যা করেছে, কারো কারো ওপর মারাত্মক হামলা চালিয়েছে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অল্প কয়েকজন লোক ও যাজক আছেন বাংলাদেশে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের হত্যা করার হুমকি দিয়েছে, কাউকে কাউকে হত্যাও করেছে। পত্রিকায় দেখেছি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি প্রভাষক সমরেন্দ্র সাহাসহ চারজনকে চিঠি ও কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।
এসব রাষ্ট্রদ্রোহমূলক সন্ত্রাসী ঘটনার আড়ালে যা লুকিয়ে আছে, তা হলো সরকারকে বিপদগ্রস্ত করা, তার চলার পথ কণ্টকিত করা। বোধ করি সরকারের আত্মশ্লাঘার কোনো পথ খোলা নেই। আত্মতৃপ্তির স্রোতে গা ভাসালে সর্বনাশ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে, এটা মেনে সতর্ক থাকতে হবে।
একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকারকে জামায়াত-শিবির ও তাদের পোষ্য সন্ত্রাসী সশস্ত্র সংগঠনগুলো কিছুতেই মানবে না। তাই তারা নাশকতার পথই বেছে নেবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার বিদায়ী ভাষণে বিশ্বসন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের নাশকতা সম্পর্কে সাংঘাতিক আতঙ্ক ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আইএসকে বিশ্বহুমকি বলে গণ্য করেছেন। বাংলাদেশের জঙ্গি মোল্লারা আইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারামকে অনুকরণ করছে। অতএব সাধু সাবধান!