চতুর্থ শিল্পবিপ্লব :প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

মানবসভ্যতার ইতিহাস তিনটি শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৭৮০ সালে শুরু হওয়া শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে শিল্পায়নের সূত্রপাত। ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরির মাধ্যমে যা ব্যাপক কলেবরে বৃদ্ধি পায়। এ সময় মানুষ শিল্পায়নের স্বাদ পেলেও ত্রাসের রাজত্ব থেকে মুক্তি পায়নি। ১৮৭০ সালে বিদ্যুত্ আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আলোকিত বিশ্ব। ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার হওয়ার ফলে কায়িক শ্রমের দিন থেকে মস্তিষ্ক নির্গত জ্ঞানের বিপ্লব ঘটেছে। শিল্পোত্পাদনের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়েছে। এই তিন বিপ্লবকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করেছে নতুন কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া, যাকে ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ বলেও সম্বোধন করা হয়ে থাকে। অনেকে এটাকেই ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করছেন।

ডিজিটাল বিপ্লবকে কেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলা হচ্ছে, সেটি নিয়ে আলোচনার জন্য সারা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতা, বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও বিশ্লেষকেরা জড়ো হয়েছেন সুইজারল্যান্ডের শহর দাভোসে। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। ডব্লিউইএফের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে নিজের লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমরা চাই বা না চাই, এতদিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্তাচেতনা যেভাবে চলেছে—সেটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তির ওপর শুরু হওয়া ডিজিটাল এ বিপ্লবের ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনো হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে, যার ফলে পাল্টে যাচ্ছে উত্পাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমন কী রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া।

ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের সমপ্রতি প্রকাশিত ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন একদিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়, গুগলে ৪২০ কোটি বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হয়। এক যুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিল অকল্পনীয়।

আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে, যা এর আগে কখনও সম্ভব হয়নি। সারা বিশ্বের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এর ফলে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাড়বে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে, ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে।

অন্য একদল অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের দ্বারা সম্পন্ন অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সম্পন্ন করা হবে, এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। এ ছাড়া শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশি করে সমস্যায় ফেলবে। এর ফলে সারা বিশ্বে সম্পদ বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা। ডিজিটাল প্রযুক্তির আবিষ্কারক, বিনিয়োগকারী দেশগুলো এর থেকে যতটা লাভবান হবে, অন্য দেশগুলো সেটা থেকে বঞ্চিত হবে। বিষয়টিকে বিজয়ী পক্ষের সব ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। যেমনটি শিল্প বিপ্লবের প্রথমদিকে ছিল। দাসে পরিণত করার মানসিকতা। অর্থাত্ যাদের সম্পদ থাকবে তারাই দুর্বলকে আরও ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বিপ্লবের প্রভাবও হবে ব্যাপক। ব্যতিক্রমী পণ্যসেবার পাশাপাশি নিয়ত পরিবর্তনশীল গ্রাহক চাহিদা পূরণে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণেও ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তি বিপ্লব সরকারি সেবাকে একদিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসবে, অন্যদিকে বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়াবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে, সেই আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকেরা।

সারাবিশ্বের আলোড়নের ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। ডিজিটাল বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ডিজিটাল যুগে অনেক বড় বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে ৬৪টি জেলার ৪,৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদের সবক’টি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশে ইতিমধ্যে সরকারের প্রধান সেবাসমূহ বিশেষ করে ভূমি নামজারি, জন্ম নিবন্ধন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনসহ বিভিন্ন সেবাখাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রবেশাধিকার লাভ করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মৌলিক সেবাসমূহ প্রদানের বিষয়টিকে আরো সহজ ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে আরো কর্মক্ষম বাংলাদেশ, আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাংলাদেশ, আরো ন্যায়সঙ্গত বাংলাদেশ, আরো অধিকতর শক্তিশালী ও সমৃদ্ধতর বাংলাদেশ। ডিজিটাল প্রযুক্তি মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। যেখানে সকলের নিকট নিজ পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য, ভালো স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। বিভিন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকায় এটি সম্ভব হয়েছে। শুধু প্রশিক্ষণ নয় সাথে দেয়া হয়েছে ল্যাপটপ, মডেম, প্রজেক্টর ইত্যাদি। এ বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। এতকিছুর পরেও আছে বিরাট শূন্যতা। বহু প্রতিষ্ঠানে উক্ত ল্যাপটপ-মডেম সঠিক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসে কন্টেন্ট তৈরির মত অবসরও থাকে না। ফলে ডিজিটাল বিপ্লবের সৈনিকগণ হাতিয়ারবিহীন সৈনিকে পরিণত হচ্ছেন। এপর্যন্ত ২০ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। সকলেই শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে ক্লাস নেন বললে হয়তো তা সঠিক হবে না। তবে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে ক্লাস নেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা প্রচুর। এর প্রমান চলমান মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা।

আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, গবেষণা, বিনোদন ইত্যাদিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে, বেড়েছে সার্বিক বাণিজ্যও। তার উদাহরণ আমরা পাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই পরিবর্তনের ছোঁয়া নিঃসন্দেহে ডিজিটাল বিপ্লবের হাতছানি দিচ্ছে। যা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি মডেল হিসেবে তৈরি করবে। স্বপ্নকে ধরতে আর জাগ্রত হয়ে চিন্তা করতে হবে না। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ মানেই সোনার বাংলাদেশ আমরা অতি সহজেই ভাবতে পারি। এগিয়ে চলুক বাংলাদেশ, এগিয়ে যাক ষোল কোটি মানুষ।