মানুষ আর বোঝা নয়, সম্ভাবনা

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরও কয়েক গ্রাম ঘুরে একজন ম্যাট্রিকুলেশন (এসএসসি) পাস শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হতো। কোনো এলাকায় কেউ স্নাতক পাস করলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত তাঁকে দেখতে। এখন সেই অবস্থা আর নেই। যেখানে এখনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি, সেখানেও বহু আগে পৌঁছে গেছে শিক্ষার আলো। পাড়ায় পাড়ায় এখন স্নাতক ডিগ্রিধারী। ডাক্তার-প্রকৌশলীও হচ্ছে গ্রামের মানুষ। কৃষি উত্পাদন ব্যাপক হারে বাড়ায় এবং শিল্পায়ন ও সড়ক অবকাঠামো গড়ে ওঠায় শিল্পপণ্য যেমন মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামের মুদি দোকানে, তেমনি কৃষকের পণ্যও আসছে রাজধানীতে। মানুষের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা—সবই পৌঁছে গেছে গ্রামপর্যায়ে। ফলে দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি জীবনমানেরও উন্নতি হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য মতে, দেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭০.৭ বছর। বিবিএসের ২০১৪ সালের তথ্য মতে, পুরুষের গড় আয়ু এখন ৬৯.১ বছর, আর নারীর ৭১.৬ বছর। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশিদের গড় আয়ুর হিসাব প্রথম করা হয় ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে। তখনকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের ওই হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের গড় আয়ু ছিল ৫০ দশমিক ৭ বছর। অর্থাৎ গত ৪২ বছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ২০ বছর। প্রতি এক বছরে প্রায় ছয় মাস করে আয়ু বেড়েছে বাংলাদেশিদের।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাব মতে, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ জনসংখ্যার বোনাসকাল উপভোগ করছে, যা ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ এ সময়ে দেশের জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি থাকে ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে। এক থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যাও কমতে থাকে। একই সঙ্গে ৫৯ বছরের ওপর জনসংখ্যা থাকে সবচেয়ে কম। মধ্যবর্তী বয়সী এই মানুষরা উপার্জন করতে পারে, ফলে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে। এতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি হয়। সর্বাধিক কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কাজের পরিবেশ তৈরি করাটা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে এখন থেকেই।

স্বাস্থ্য খাতের বিকাশের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে দেশে একদিকে যেমন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, অন্যদিকে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে দেশের জনসংখ্যা বোঝা নয়, এটি হতে পারে সম্পদ। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর সুবর্ণ সুযোগ এখনই। জাপান, চীন, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীস্বল্পতায় শঙ্কিত, সেখানে বাংলাদেশ ঠিক তার উল্টো। বাংলাদেশে এখন আধিক্য কর্মক্ষম মানুষের। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে

বার্ধক্যে পড়া লোকের সংখ্যাই বেশি। জনসংখ্যাবিশারদদের ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যা থেকে ‘লভ্যাংশ’ পাওয়ার সময়। জনমিতির পরিভাষায় ডিভিডেন্ড বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের আধিক্য। এটিকে বলা হয় জনসংখ্যার বোনাস কাল। বিশ্বের যেকোনো দেশ এ সুযোগ একবারই পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ তৈরি হয়েছে ২০১২ সাল থেকে। এ বয়সসীমার মানুষই সবচেয়ে কর্মক্ষম, যাঁরা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। বিবিএসের সবশেষ তথ্য মতে, বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি সাত লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৩৯ শতাংশ।

জানতে চাইলে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূর-উন নবী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো দেশের জন্য জনসংখ্যার বোনাস কাল একবারই আসে। আর এটি ২৫ থেকে ৩০ বছর স্থায়ী থাকে। তাঁর মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে সবার আগে প্রয়োজন জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া। বিদেশের শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। নূর-উন নবী আরো বলেন, কর্মক্ষম মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আর তা করতে গেলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সামগ্রিকভাবে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি বলে মত দেন তিনি। ২০৩১ সালের পর বার্ধক্যে পড়া লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে, এখন থেকেই তাদের জন্য বিকল্প চিন্তাভাবনা শুরু করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে নিযুক্ত প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবির। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তাহলে জনসংখ্যাকেও জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।’

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এই ডিভিডেন্ডকে অবশ্যই সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। একে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে নিতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা। সর্বাধিক কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীকে সর্বাধিক কাজে লাগাতে হলে প্রচুর কাজের সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে হবে। অবকাঠামো সৃষ্টিতে সর্বাধিক সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া নজর দিতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে। সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য এবং আয়বৈষম্য কমিয়ে রাখার প্রয়োজনে দুর্নীতি দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে শোষণ করে শিক্ষা-দীক্ষা, কলকারখানা, অবকাঠামোসহ নানা ক্ষেত্রে একটা সময় পর্যন্ত অনেক এগিয়ে থাকা পাকিস্তানের মানুষও এত দিন বাঁচে না। পাকিস্তানিদের চেয়ে গড়ে প্রায় চার বছর বেশি বাঁচে বাংলাদেশের মানুষ। পাকিস্তানের মানুষের গড় আয়ু ৬৬ বছর। আর মাথাপিছু আয়ে অনেক এগিয়ে থাকা ভারতের মানুষের চেয়েও বাংলাদেশের মানুষ বাঁচে গড়ে দুই বছর বেশি। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় অন্য সব সূচকের মতো গড় আয়ুতেও ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ।

ইউএনএফপিএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হওয়ায় মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকবে। সংস্থাটি বলছে, ২০২১ সালে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়াবে ৭৩ বছরে। আর ২০৬১ সালে সেটি বেড়ে হবে ৭৯ বছর। পুরুষের চেয়ে নারীর গড় আয়ু বাড়বে বেশি। ২০৬১ সালে যখন একজন পুরুষের গড় আয়ু থাকবে ৭৮ বছর, তখন একজন নারীর গড় আয়ু থাকবে ৮০ বছর। মূলত বেশি টেনশন করার কারণে পুরুষের গড় আয়ু কম বলে মনে করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

বিবিএসের মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ বলেন, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে বহুগুণ। দেশে বেকারের সংখ্যা কমেছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে। মানুষ এখন আর না খেয়ে থাকে না। সরকার গরিব লোকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রে অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। এসব কারণে মৃত্যুহার কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের গড় আয়ুও বাড়ছে। পুরুষের তুলনায় নারীর গড় আয়ু বেশি হওয়া প্রসঙ্গে আবদুল ওয়াজেদ বলেন, নারী তুলনামূলক কম টেনশনে থাকে। পুরুষ বেশি টেনশন করার কারণে তাদের গড় আয়ু কম।

বিবিএসের ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে তিন বছরে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুবাদে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে। এ সময়ে অর্থনীতিতে নারীর অবদান বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। দেশে এখন কর্মসংস্থান আছে পাঁচ কোটি ৮১ লাখ মানুষের। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ১২ লাখ, বাকি এক কোটি ৬৮ লাখ নারী। এর আগের জরিপ অনুযায়ী তখন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল পাঁচ কোটি ৪১ লাখ। সে হিসাবে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪০ লাখ। এই সময়ে শিল্প ও সেবা খাতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। ২০১০ সালে এক কোটি ৬২ লাখ নারী কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। সেটি এখন বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৬৮ লাখ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ বলতে একসময় দরিদ্র, অশিক্ষিত, অদক্ষ আর অপুষ্টিতে ভোগা ভঙ্গুর দেহের ক্লান্ত চেহারা ফুটে উঠত। কয়েক গ্রাম পর পর স্কুল ছিল। আদরের সন্তানদের মুখে দুই বেলা খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রামে জর্জরিত মা-বাবা স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতেন শিশুদের। অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যেত জন্মের পরপরই। ভঙ্গুর দেহে অকালে মরণ হতো শিশুদের। এখন আর সেই অবস্থা নেই। স্কুলগামী শিশুর হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হওয়ার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও কমেছে। ফলে ভবিষ্যতে একটি শিক্ষিত জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেড় দশক আগেও দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ছেলে শিশুদের স্কুলে পাঠানো হলেও মেয়ে শিশুদের গৃহকর্মে বন্দি রাখা হতো। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আসছে। দেশের পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ এশিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সেখান থেকে ফিরে এসে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা। ছেলেদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মেয়ে শিক্ষার্থীও বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি খাতে শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছে।

শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায়ও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরকারের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের হাসপাতাল-ক্লিনিকও গড়ে উঠেছে মফস্বল পর্যন্ত। ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে সারা দেশের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত জেলাসদর কিংবা রাজধানীতে আনা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিটি বিভাগে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল গড়ে উঠায় মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একসময় সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সারা দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বেসরকারি সংস্থাগুলোও। ২০১৪ সালে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬২.২ শতাংশ। আগের বছরে এর হার ছিল ৬২.৪ শতাংশ। ২০১২ সালেও জন্ম নিয়ন্ত্রণের হার ছিল ৬২.২ শতাংশ। জন্ম নিয়ন্ত্রণের ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার যেমন কমেছে, তেমনি পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম হওয়ায় উপার্জনকারী সদস্যের ওপর নির্ভরশীলদের সংখ্যাও কমছে। এতে পরিবারগুলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি অর্থ খরচ করতে পারছে।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসছে। ২০১০ সালের জরিপে নির্ভরতার হার ছিল ৬৯ শতাংশ, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭ শতাংশে। অর্থাৎ আগে একজন নারী তাঁর পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকতেন। সেটি প্রতিনিয়তই কমছে। অর্থাৎ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের সবাই কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া গত তিন বছরে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার হারও কমে গেছে। মানুষ এখন ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের দিকে ঝুঁকছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ৪৫ শতাংশ মানুষ। আর ৫৫ শতাংশ মানুষ ম্যানুফ্যাকচারিং ও অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে শিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবের কারণে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উত্পাদনশীলতা ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার চেয়ে অনেক কম। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাংলাদেশ এক কোটিরও বেশি শ্রমশক্তি রপ্তানি করে বছরে ১৫ বিলিয়ন (এক হাজার ৫০০ কোটি) ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করছে। অথচ এর চেয়েও অনেক কম জনশক্তি রপ্তানি করে ফিলিপাইন আরো বেশি রেমিট্যান্স পাচ্ছে।

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে যেখানে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৭.২ শতাংশ, ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৬ শতাংশে। সাত বছরের বেশি বয়সীদের শিক্ষার হারের আলোকে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের শিক্ষার হার ৬০.৭ শতাংশ। আর নারীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৫৬.৬ শতাংশ। গ্রামে ৫৭.২ শতাংশ পুরুষ ও ৫৩.১ শতাংশ নারী শিক্ষিত। শহর অঞ্চলে ৭০.৫ শতাংশ মানুষ সাক্ষরতার আওতায় এসেছে। শহরে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭২.৬ শতাংশ। আর নারীর সাক্ষরতার হার শহর অঞ্চলে ৬৮.৬ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে আলোর উৎস হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে ৬৮ শতাংশ মানুষ। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ৬৬.৯ শতাংশ। কেরোসিন ব্যবহারকারী কমে দাঁড়িয়েছে ৩১.৪ শতাংশে, যা ২০১৩ সালে ছিল ৩২.৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩.৫ শতাংশে, যা ২০১৩ সালে ছিল ৬৩.৩ শতাংশ। এখনো খোলা স্থানে মলত্যাগ করে ২.১ শতাংশ মানুষ। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ২.২ শতাংশ।

বিবিএসের মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ বলেন, মোটা দাগে দুটি কারণে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। প্রথমত, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন আর দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি। তিনি বলেন, দেশে এখন বাচ্চাদের টিকা দেওয়ার হার বেড়েছে। আগের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবার মান বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হারও বেড়েছে। মানুষ তার নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি এখন বেশ যত্নশীল। সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবহার বেড়েছে। সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষ এখন বেশ সচেতন। এ ছাড়া দেশে কলেরার মতো মহামারি বা বড় ধরনের কোনো রোগবালাই নেই বললেই চলে।