কঠোর হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সের নীতিমালা

রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে যানজটে পড়ে সংসদ সদস্যের ছেলের এলোপাতাড়ি গুলিতে দুজন নিহত হয়। গাইবান্ধায় সংসদ সদস্যের গুলিতে রক্তাক্ত হয় এক শিশু। গত বছর সাত মাসের ব্যবধানে এই দুটি ঘটনাই ঘটানো হয়েছিল বৈধ অস্ত্র দিয়ে। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ও হয়। এমন অবস্থায় বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে কেউ যেন অবৈধ কাজ করতে না পারে সে জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা কঠোর করতে যাচ্ছে সরকার।

নতুন নীতিমালায় পিস্তলের লাইসেন্সধারীরা ৫০টির বেশি গুলি রাখতে পারবেন না। শটগানের ক্ষেত্রে ১০০টির বেশি রাখা যাবে না। গুলি কোথায় খরচ হয়েছে তার যৌক্তিক জবাব দিয়ে তবেই নতুন করে গুলি কিনতে পারবেন একজন লাইসেন্সধারী।

এ ছাড়া আগে প্রতিষ্ঠানের নামে অগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হলেও এখন থেকে তা আর হবে না। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তার নামে নিতে হবে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স।

এসব নিয়ম করেই আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের নতুন নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নীতিমালাটির নামকরণ হচ্ছে ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা’। খসড়াটি স্বরাষ্ট্রসচিব হয়ে এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের টেবিলে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রীর কাছে যদি মনে হয় কিছু জায়গায় পরিবর্তন করা দরকার তাহলে করতেই পারেন।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারী যেই হোন না কেন সবাইকে একই নিয়ম মানতে হবে। সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য।’

নতুন নীতিমালায় ৩০ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তির নামে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা যাবে না। বৈধ অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তি ভোগ করার বিধানও রয়েছে। অপরাধীদের কাছে অস্ত্র ভাড়া দেওয়া হলে লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, আগের নিয়মে পিস্তলের লাইসেন্সধারী ৫০টি গুলি কিনতে পারতেন। যতবার খুশি কিনতে পারতেন। নতুন নিয়মে ৫০টি গুলির মধ্যে যে কটি খরচ হবে সেগুলো কী কাজে খরচ হয়েছে তার পুঙ্খনাপুঙ্খ জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে। গুলি কেনার সময় এই জিডির কপি জমা দিতে হবে। যে কটি গুলি খরচ হয়েছে তার বেশি কিনতে পারবেন না। এর বেশি কিনলে ক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই কর্মকর্তা আরো জানান, নতুন এ নিয়মের কারণে কেউ বৈধভাবে গুলি কিনে সেটা সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায়, এখনকার নিয়মের শিথিলতার কারণে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীরা গুলি কিনে বেশি দামে সেগুলো সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর আবার লাইসেন্স দেখিয়ে কোটা অনুযায়ী ৫০টি কিনে নিতে পারেন। নতুন নীতিমালায় যেটি করা হচ্ছে তাতে কোনো কারণে ১০টি গুলি খরচ হলে সেটির কারণ জানিয়ে থানায় জিডি করতে হবে। এতে করে আগের মতো সন্ত্রাসীদের কাছে গুলি বিক্রি করতে পারবে না কেউ। এ ছাড়া যাঁরা শটগানের লাইসেন্স পাবেন তাঁরা ১০০টি গুলি রাখতে পারবেন। তাঁদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম করা হচ্ছে নতুন নীতিমালায়।

খসড়া নীতিমালায় আরো আছে, কোনো লাইসেন্সধারী যদি লাইসেন্স পাওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র না কেনেন তাহলে তাঁর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগের নিয়মে প্রতিষ্ঠানের নামে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হতো। কিন্তু নতুন নীতিমালায় সেটি পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তার নামে দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে। একজন নির্বাহী কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে।

আগের নীতিমালা অনুযায়ী, পর পর তিন অর্থবছরে তিন লাখ টাকা করে যাঁরা আয়কর দিয়েছেন তাঁরা পিস্তলের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নতুন নিয়মে সেটি পাঁচ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে পুলিশের সত্যতা যাচাইয়ের (ভেরিফিকেশন) বাধ্যবাধকতা আগের মতোই থাকছে। তবে স্পিকার, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারক থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আয়কর দেওয়ার এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

উল্লেখ্য, গত বছর ২ অক্টোবর গাইবান্ধার-১ আসনের সংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু সৌরভ গুলিবিদ্ধ হয়। এর আগে ১৩ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে যানজটে পড়ে বিরক্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালান সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। এতে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও অটোরিকশাচালক ইয়াকুব নিহত হন।