সরকারের দুই বছর সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ

লেখক : এম. নজরুল ইসলাম অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

দুই বছর পার করল গত ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই বছরে সরকার দেশকে নিয়ে গেছে সমৃদ্ধির সোপানে। দুই বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে’।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ আজ নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারে। নিজের পরিচয়ে বিশ্ব দরবারে বিশেষ স্থান করে নিতে পেরেছে দেশটি। আর সবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ইস্পাতদৃঢ় নেতৃত্বের গুণে। টানা সাত বছর তাঁর দেশ পরিচালনার পথটি নিষ্কণ্টক ছিল না। দেশের অভ্যন্তরে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে। কিন্তু শেখ হাসিনা অটল থেকেছেন তাঁর সঙ্কল্পে। কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর ফলও পেয়েছেন তিনি। বিশ্বে আজ বাংলাদেশ সম্মানজনক একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সৃষ্টি করেছে নতুন উদাহরণ। উন্নত বিশ্ব এখন বাংলদেশকে বিবেচনা করছে উন্নয়নের মডেল হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশসেবার ব্রত সাধনায় অবিচল শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি স্বাধীনতা ও বাংলাদেশবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তা-ব চালিয়েছিল সারাদেশে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিহত করতে চেয়েছিল। বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিল বাংলাদেশে চরম অশান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু জনগণের সেবক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সর্বশক্তি নিয়ে জামায়াত-বিএনপি জোটের সব অপচেষ্টা রুখে দেয়। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেন, মানুষের ভালবাসা রাজনীতিতে যোগ করে ভিন্ন এক মাত্রা, যেখানে জঙ্গী-তা-বের কোন স্থান নেই। মানুষের ভালবাসা ও সমর্থন যে সবসময় শেখ হাসিনার সঙ্গে আছে, তা উঠে এসেছে বিদেশী জরিপেও। যেখানে বলা হচ্ছে, ‘নেতৃত্বে দ্বিধাগ্রস্ততা এবং কর্মীদের হতাশা নিয়ে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের যে জনসমর্থন ছিল, এখন তা আগের চেয়ে অনেক বেশি।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরই) ২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, নির্বাচন ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিভাজন থাকলেও আওয়ামী লীগের পক্ষেই পাল্লা এখন ভারি। বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান গতি নিয়েও জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা সন্তোষ জানিয়েছেন। সামনে আরও সম্ভাবনা দেখছেন তারা।
বিগত দুই বছরের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নই সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দুই বছর আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ততটা আশাবাদী ছিল না। কিন্তু দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে তাদেরও অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ; যা সরকারের আশার কাছাকাছি। পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরুও বর্তমান সরকারের অর্জনের মুকুটে আরেকটি স্বর্ণপালক যোগ করেছে। বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর নির্মাণ কাজ এই মেয়াদে শেষ করার আশা করছে সরকার। মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। এই সময়ে অবকাঠামো উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পরমাণু বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগের ৫ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অচিরেই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে এসেছে। ২০০৬ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.২ শতাংশ। এখন তা ৭.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারী ও বেসরকারীভাবে দেড় কোটি মানুষের চাকরি হয়েছে। ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৮ কর্মী বিদেশে গেছে কাজ নিয়ে। রেমিটেন্স ১৫.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রফতানি আয় বেড়ে হয়েছে ৩২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিদ্যুত উৎপাদনে সক্ষমতা ১৪ হাজার ৭৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুত কেন্দ্রের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত সুবিধা পাচ্ছে। গ্যাস উৎপাদন দৈনিক ২ হাজার ৭২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে। চাহিদা মিটিয়ে চাল এখন রফতানি হচ্ছে। শিক্ষায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষার হার ৭১ শতাংশ। সাত বছরে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ১৯২ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যাওয়া হয়েছে মানুষের দোরগোড়ায়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন মহাযজ্ঞ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও দৃষ্টি কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ ২০১৬ সালের বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার কারণে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। ফলে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৬ শতাংশ। এর আগে চলতি বছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ অর্জন হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ‘সিএনএন মানি’। গত ১ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘সিএনএন মানি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ প্রবৃদ্ধির দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী দেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক দুর্দশা, শত ঝড়ঝঞ্ঝায়ও মানুষ আশাহত হয় না, বরং সব সময় আশাবাদী। আর এ আশাবাদ বিবেচনায় বিশ্বের সব দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। এমনকি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রত্যাশায়ও বাংলাদেশের মানুষ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। এ বিবেচনায় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আশাবাদ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সুখ এ তিনটি আলাদা সূচকের ওপর পরিচালিত জরিপে ২০১৬ সাল বাংলাদেশের জন্য আরও ভাল হবে না খারাপ হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের ৮১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে আগামী বছরটি আরও ভাল যাবে। জরিপে বলা হচ্ছে, এ দেশের ৭৪ শতাংশ মানুষই আশাবাদী যে, ২০১৬ সাল তাদের জন্য সম্ভাবনা বয়ে আনবে। ২০১৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হবে, না আরও কঠিন হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ৭২ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক আশাবাদের কথা জানায়। অন্যদিকে সুখ সূচকে প্রশ্ন করা হয় বর্তমান জীবন নিয়ে মানুষ সুখী কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ জানায় তারা সুখী।
মানুষের মনোজগতের এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে কেবল শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণে। তিনি জানেন মানুষের মনে কিভাবে স্বপ্নের বীজ বপন করতে হয়। মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে দিনযাপন করে, সেই স্বপ্নকে কিভাবে বাস্তবে রূপ দিতে হয়, তা জানেন জনগণের নেত্রী। ফলে তাঁর দ্বারাই সম্ভব হয়েছে দেশের উন্নয়ন। মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছেন তিনি। গত কয়েক বছরে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের বই বিতরণ, বছরের প্রথম দিন থেকে শিক্ষাপঞ্জি শুরু ও উপবৃত্তি দিয়ে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়েছে, তার রূপকার শেখ হাসিনা। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের মানুষও সবসময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। মানুষের প্রতি জননেত্রী শেখ হাসিনার যে পর্বতসমান আস্থা, সেই জনআস্থার স্বীকৃতিও দিয়েছে দেশের মানুষ। বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিপুল বিজয় বলে দিচ্ছে সরকার ও সরকারী দলের ওপর মানুষের আস্থা বাড়ছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সরকার গত ৭ বছরে নিরলস চেষ্টায় ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বিপুল অগ্রগতি সাধন করেছে। গত অর্থবছরে আইটি এবং আইটিএস খাত থেকে আয় হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং একের পর এক দ- কার্যকর সক্ষমতার সঙ্গে সরকারকে জনসমর্থনপুষ্ট করেছে। এই জনসমর্থন আগামী দিনগুলোয় আরও বাড়বে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। দেশের মানুষ নিরুপদ্রব জীবনযাপন করতে চায়। মোটা ভাত, মোটা কাপড়ে সন্তুষ্ট জনগণ চায় জঙ্গী-সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ। জামায়াত-বিএনপি জোট সৃষ্ট জঙ্গী দমনেও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান সরকার। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব এই দেশকে আরও এগিয়ে দেবে এ বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। সমৃদ্ধির সোপান বেয়ে বাংলাদেশ একদিন সর্বক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি আমরাও মনে করি, অর্থনীতির চাকা সচল থাকলে নির্বিঘেœই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে আওয়ামী লীগ। দুই বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে সরকারকে অভিনন্দন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করুক, এই প্রত্যাশা আমাদের।