বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাড়ছে রেমিট্যান্স। ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ। সরকারি প্রতিষ্ঠান যেখানে ব্যর্থ, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে সাফল্য। প্রতিদিনই বিশ্বের কোনো না কোনো প্রান্তে বাংলাদেশি ছিনিয়ে নিচ্ছেন সাফল্যের মুকুট। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমীক্ষায় বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ‘নেক্সট ইলেভেন’ সম্মিলিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। লন্ডনের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা লিখেছে, ২০৫০ সালে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বের নাম-করা রেটিং-বিশেষজ্ঞ সংস্থা মুভিস ও স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশকে সন্তোষজনক অর্থনৈতিক রেটিং দিয়ে যাচ্ছে।
এ অগ্রগতিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ‘ঈর্ষণীয়’ বলে বর্ণনা করেন। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে এটা নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই; বরং এসব মৌলিক ক্ষেত্রের অগ্রগতি জাতি গঠনের জন্য যে বুনিয়াদ রচনা করেছে, তার ওপর একটি সুখী, সমৃদ্ধ, অগ্রসর জাতি হিসেবে দাঁড়াতে হলে আমাদের আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
বাংলাদেশের জনসাধারণের জীবনমান উন্নত হয়েছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার অনেক কমেছে। কিন্তু এখনো প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সহযোগিতায় সন্তান প্রসবের হার বেশ কম। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় সমান হয়েছে, কিন্তু মেয়েশিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার এখনো অনেক বেশি। এসব ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ, বিশেষত জাপান কিংবা থাইল্যান্ডের পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে হলে আমাদের আরো অনেক কিছু করতে হবে।
অর্থনীতিতে অগ্রযাত্রা শূন্য থেকে শুরু করে আজ বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ২২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই এখন একমাত্র দেশ যা রিজার্ভ থেকে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই কম-বেশি বাংলাদেশিরা চাকরিসহ নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে। তাদের আয় থেকে বাংলাদেশে প্রতি মাসে বৈদেশিক মুদ্রা আসে শত কোটি ডলারের বেশি।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ঘাত-প্রতিঘাত পেছনে ফেলে স্বাধীনতার ৪৪ বছরেই বাংলাদেশ আজ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের স্বপ্ন দেখে। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটিতে এখন বছরে ৪ কোটি টন চাল উৎপাদন হয়। দুই বছর আগেও যা ছিল সাড়ে ৩ কোটি টনের নিচে। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে আরেকটি মাইলফলক। ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। আর এতে পাল্টে গেছে জিডিপির গ্রাফ।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে শুধু কৃষি খাতে জিডিপির অবদান ২১ শতাংশ। আর কৃষিশ্রমে ৪৮ শতাংশ। কৃষির সাব-সেক্টরসহ এ পরিসংখ্যান ৫৬ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ। আর আলু উৎপাদন কৃষি খাতের সাফল্যের এক বিস্ময়। এক দশক আগেও উৎপাদন ছিল ৫০ হাজার টনের নিচে। এখন তা এগোচ্ছে কোটি টনের দিকে।
স্বাধীনতার ৪৪ বছরে দেশের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যোগাযোগ খাতে বঙ্গবন্ধু সেতু মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। রাজধানীর যানজট নিরসনে মহাখালী, খিলগাঁও, গুলিস্তান ও কুড়িল ফ্লাইওভারও বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হবে শিগগির। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক, দ্বিতীয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতুসহ বড় বড় প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে নৌপথ সচল করতে দেশের ৫৩টি নদীর খননকাজ চলছে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর আগে একসঙ্গে এতগুলো নদী খননের কাজ হয়নি। বর্তমান সরকার প্রথম দফায়ই এ প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিস্নউটিএ) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ ক্ষেত্রে প্রথম দফায় ২৪টি এবং দ্বিতীয় দফায় ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ খনন করা হবে।
এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প। একসময়ের আমদানিকারক দেশ এখন ওষুধের রপ্তানিকারক দেশের গৌরবে গৌরবান্বিত। দেশের উৎপাদিত ওষুধ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণসহ প্রায় ১০০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। পৃথিবীর অনুন্নত ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ওষুধশিল্পে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধের কাঁচামালের ৩০ শতাংশ তৈরি হচ্ছে স্থানীয়ভাবে, বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ আসছে বিদেশ থেকে। দেশেই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করতে পারলে প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার) ওষুধ রপ্তানি করা সম্ভব। পরিশেষে বলতে হয়, আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশের জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। আমি এ ক্ষেত্রটিতে আরো বেশি গুরুত্বারোপ করতে চাই। কারণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা সুশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা থেকে শুরু করে সব রকমের সামাজিক সেবা খাতের অগ্রগতি বিঘি্নত করতে পারে।