গ্রামমুখী উন্নয়নে জোর দিচ্ছে সরকার

এবার গ্রামমুখী উন্নয়নে আরও জোর দিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচি’ ও ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প’ অন্যতম। এর বাইরে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের স্বাবলম্বী করতে বর্তমান সরকার কয়েক বছর আগে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যা এখনও চলমান রয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী মার্চে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে প্রশিক্ষণের কার্যক্রম শুরু করা হবে। গ্রামের শিক্ষার্থীসহ যুবকদের বিশেষায়িত বাসের মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেবে আইসিটি বিভাগ। তারই অংশ হিসেবে কেনা হচ্ছে বিশেষায়িত ৬টি বাস। বাসগুলো সারাদেশে ঘুরে ঘুরে প্রান্তিক জনগণকে আইসিটি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে একটি প্রশিক্ষিত, দক্ষ জনবল সৃষ্টি করবে। এই ধারাবাহিকতায় আইসিটি ডিভিশনে একটি বাস এসে পৌঁছেছে। বাকি ৫টি বাসও শিগগিরই এসে পৌঁছাবে। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হবে।

আইসিটি বিভাগ জানায়, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের তত্ত্বাবধানে আইসিটি বিভাগ এ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
আইসিটি বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের জানিয়েছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বাসগুলো চালু করা হচ্ছে।

আইসিটি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম বাসটিতে ১৬টি চেয়ার-টেবিল ছাড়াও আইসিটি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। আইচ্যার কোম্পানির বাকি বাসগুলোতে ২২টি করে চেয়ার-টেবিল সেট সংযুক্ত করা হবে বলে জানায় আসিটি বিভাগ।

আইসিটি বিভাগের দক্ষ প্রশিক্ষক দল এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে জানায় আইসিটি বিভাগ। স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব লোকবল দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় থাকবে মোবাইল ফোন অপারেটর রবি।শহরমুখী মানুষের স্রোত কমাতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নতুন করে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় আগামী ৫ বছরে দেশের সব গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রামগুলোতে কর্মসংস্থানের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ তৈরি হবে এবং মানুষ শহরে আসতে নিরুসাহিত হবে বলে সরকার আশা করছে।

এছাড়া গ্রামে শহরের নাগরিক জীবনের স্বাদ পৌঁছানোর জন্য ‘পল্লী জনপদ নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্প’ নামে সমবায়ভিত্তিক বহুতল ভবন নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রংপুর বিভাগের একটি করে মোট ৭টি এলাকায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৪ কোটি ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ৩৬২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে ৬১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শহরমুখী মানুষের স্রোত কমাতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকীতে গৃহীত পরিকল্পনার বিষয়ে ড. শামসুল আলম বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে গ্রামগুলোতে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাতে করে গ্রামভিত্তিক ছোট ছোট শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে পারে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও বেশি চাঙ্গা করতে নানা বিষয় রয়েছে এ পরিকল্পনায়।’
জানা গেছে,

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০০৯-২০১৪) এ হার বেড়েছে ৬ শতাংশ। মূলত:কর্মসংস্থানের অধিক সুযোগ এবং নাগরিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশের কারণেই শহরের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ মানুষের। এছাড়া শিক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার কারণেও প্রতিনিয়ত শহরমুখী হচ্ছে মানুষ।

এদিকে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে শহরগুলো এখন ঝুঁকির মুখে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা, যানজট ও পরিবেশ দূষণ ক্রমর্ধমান নাগরিক জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় জনদুর্যোগ ঠেকাতে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিবিএস-এর ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ-২০১৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পল্লী অঞ্চল থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তরের হার বাড়ছে। ২০০৯ সালে যেখানে পল্লী অঞ্চল থেকে শহরমুখী মানুষের হার ছিল ২১ দশমিক ৯ শতাংশ, সেটি এখন বেড়ে ২০১৪ সালে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ২ শতাংশে।

শুধু পল্লী অঞ্চল থেকে নয়, এক শহর থেকে আরেক শহরেও মানুষের স্থানান্তরের হার বেড়েছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ হার দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০০৯ সালে এটা ছিল ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে শহর থেকে পল্লী অঞ্চলে স্থানান্তরের হার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। শহর থেকে পল্লী অঞ্চলে স্থানান্তরের হার ২০০৯ সালে ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে এটা ৫ দশমিক ১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

শহর থেকে পল্লী অঞ্চলে স্থানান্তরের হারে তেমন একটা পরিবর্তন না হলেও পল্লী থেকে পল্লীতে মানুষের স্থানান্তরের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সেটি খুব বেশি নয়। ২০১৩ সালের হিসাবে এ হার দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে এটা ছিল ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
শহরমুখী জনস্রোত নিয়ন্ত্রণে সরকারের করণীয় বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন,‘গ্রাম থেকে শহরে বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো শহরে মানুষ আসা কমাতে হলে সামগ্রিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, শিল্পায়ন গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ হিসেবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং জেলা প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেই সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোতে নানা সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। যাতে মানুষকে কোনো কাজের জন্য শহরমুখী হতে না হয়। মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে।’

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘১৯৫০ সালে যেখানে ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করতো, সেখানে আগামী ২০৫০ সালে ৬৫ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। বাংলাদেশের চিত্রও একই।’

‘জোর করে মানুষের শহরে আসা আটকানো যাবে না’ এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এজন্য গ্রামে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মানুষ যাতে কাজ পায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগসহ অন্যান্য সুবিধা পায় সে বিষয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। গ্রামীণ উন্নয়নে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।’

বিবিএসের প্রতিবেদনে দেশের বাইরে যাওয়া জনগণের একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শহর থেকে বিদেশ যাওয়া হার দিন দিন বাড়ছে। ২০১৪ সালে এ হার দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশে, যা ২০০৯ সালে ছিল ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পল্লী অঞ্চল থেকে বিদেশে স্থানান্তরের হার বাড়লেও শহরের তুলনায় তা অনেক কম। ২০১৪ সালে এ হার দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে, যা ২০০৯ সালে ছিল ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।