উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাক দেশ :: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারা এখন মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গতিধারাকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য এ ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। দেশ এখন উন্নয়নের ঐতিহাসিক দিক-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দল-মত ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান তিনি। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করে যোগ করতে চাই যে, বাংলাদেশের উন্নয়নধারা বজায় রাখার স্বার্থে দেশের স্থিতিশীলতাও অপরিহার্য। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টে অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

যে কোনো উপায়েই এই অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে হবে। কোনো শক্তিই যেন দেশের স্থিতিশীল অবস্থা নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে গভীর নজর রাখতে হবে। জঙ্গি তৎপরতা দ্বারা দেশের পরিস্থিতি নাজুক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর পেছনে রয়েছে সুযোগসন্ধানী কোনো কোনো মহল। জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর অশুভ তৎপরতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। দেশ যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে উন্নয়নকে কেউ থামিয়ে দিতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন খাতে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে ধাবমান।

দেশের মানুষ শেখ হাসিনার প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তাঁর দ্বারাই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম এই বিশ্বাসে কোনো সংশয় নেই তাদের। একটি দেশ উন্নতির দিকে ধাবমান রয়েছে নানা কর্মকা-ই তার প্রমাণ তুলে ধরে। অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার বিশেষ নজর দিয়েছে। দেশকে উন্নতির চরম সোপানে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন বিশেষভাবে জরুরি।

অবকাঠামোর উন্নয়নের গুরুত্ব অনুধাবন করেই সরকার এই খাতটিতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছে। যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থা এবং বিদেশিদের অর্থ বিনিয়োগের জন্য সরকার আহ্বান করেছে। তারা যদি অর্থ বিনিয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতের আরও আমূল পরিবর্তন ঘটবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ইতোমধ্যে সরকার রাজধানীবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে অনেকগুলো উড়াল সেতু নির্মাণ করেছে। পরিকল্পনা ও নির্মাণাধীন রয়েছে আরও কতগুলো। ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ চলছে এখন। পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে সরকার জয়ী হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে। আর এতে উপকৃত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠবে।

বিএনপির শাসনামলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল স্মরণযোগ্য। এ কারণে দেশ প্রায় অন্ধকারে তলিয়ে থাকত। ওই সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এতে দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে মার খায়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানোর দিকে নজর দেন। বর্তমানে দেশের মানুষ বিদ্যুতের আলো পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, প্রতিটি মানুষের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেবেন। তিনি এটা পারবেন বলে আমরা আশা করি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রধানমন্ত্রী নজির স্থাপন করেছেন।

একটা সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলত। এখন সে পরিস্থিতি নেই। কোথাও বিদ্যুৎ গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে আসে। দেশ যে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে এসেছে, এর পেছনে বিদ্যুতের অবদান অনেক। সরকার স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা ছাড়াও বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আনছে। বর্তমানে প্রচুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এগুলো উৎপাদনে গেলে বিদ্যুতের চেহারা আরও পাল্টে যাবে। সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও স্থাপন করেছে। এ থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে আমাদের জন্য বিশাল অর্জন রচিত হবে। রাশিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করায় অনেকেই নাখোশ। এ নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিও ছড়ানো হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় একটি মহল এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে উঠেপড়ে লাগে।

দেশকে দ্রুত শিল্পায়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য অবশ্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না দেশে। তারপরও সরকার চেষ্টা করছে উদ্যোক্তারা যাতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করেন। সরকারের ব্যবস্থাপনায় যেসব শিল্প-কলকারখানা রয়েছে, সেগুলোকে নতুন উদ্যমে চালুর পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে। তবে আগে সরকারকে এসব খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। সরকারি মিল-কারখানা হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়ে চলছে। লোকসানের কারণ দুর্নীতি। প্রশাসন আন্তরিক হলে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে।

এটা একটি বিশেষ ভিশন বলে আমরা মনে করি। এতে যদি সরকার সফল হতে পারে, তাহলে উৎপাদন বাড়বে, দেশের বেকার সমস্যাও অনেকটাই দূর হবে। এ কাজটিকে সফল করে তুলতেই হবে। এখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভর করে কি-না, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক উন্নয়ন কাজের বড় বাধা বলে আমরা মনে করি। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা আমলাতান্ত্রিকতা এখনও পুরোপুরিভাবে আমরা অপসারণ করতে পারিনি।

শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষা খাতেও এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে। অবৈতনিকভাবে পড়ারও সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তবে বছরের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হলেও এ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এ বছর বিনামূল্যে যেসব বই দেওয়া হয়েছে, তার কাগজ এবং ছাপার মান খুব ভালো ছিল না। সরকারকে এ দিকটির প্রতি নজরদারি বাড়ানো দরকার। বই ছাপানোর কাজ যাঁরা পান এবং যাঁদের মাধ্যমে এ কাজটি দেওয়া হয়, তাঁরা ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন কি-না, তা তদন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।

এরপরও আমরা বলব, সরকার শিক্ষার আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিশাল পরিকল্পনার এখনও আলোর মুখ দেখেনি। এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে পিছিয়ে আছে বলে আমাদের ধারণা। বিগত সরকারে থাকার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর স্কুলগুলোর ব্যাপক উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহাপরিকল্পনা যদি এতদিন আলোর মুখ দেখত, তাহলে রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা অনেক উপকৃত হতো। রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল। তবে অনেক সরকারি স্কুল রয়েছে।

যেগুলো বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। এগুলোর জায়গা, ভবন বেদখল হয়ে পড়েছে ইতোমধ্যেই। সরকার যদি রাজধানীর স্বল্প আয়ের নগরবাসীর কথা চিন্তা করে সরকারি স্কুলকে আধুনিক মানের হিসেবে গড়ে তোলে এবং অধিক শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ সৃষ্টির চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের নগরবাসী অনেকটাই বেঁচে যাবে। রাজধানীর বেসরকারি স্কুলগুলোর লাগামছাড়া বেতন এবং ভর্তি ফি দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে তার সন্তানকে পড়ানো প্রায় অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নগরবাসীর নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবেই সরকারি স্কুলগুলোকে বহুতল ভবন করে সর্বাধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আমাদের প্রশ্ন- প্রধানমন্ত্রীর এই মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তব রূপ পাচ্ছে না? কাদের কারণে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না সরকারকেই তা বের করতে হবে এবং রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে রাজধানীর প্রতিটি সরকারি স্কুলকে বহুতল বভনসহ সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধায় রূপান্তর একান্ত জরুরি।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। দেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশেও দ্রুত পৌঁছাবে এবং আর বেশি দেরি নেই উন্নত বিশ্বের দেশের কাতারে বাংলাদেশ নিজেকে শামিল করে নেওয়ার। এসবই সম্ভব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ রাষ্ট্র পরিচালনায় কারণে। তিনি দেশকে বলিষ্ঠভাবে পরিচালনার মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমানের যে উন্নতি সাধন করেছেন, তা বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতারাও স্বীকার করছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে যে উন্নয়নধারা চলছে, তাতে তাঁর সহযোগিতা অব্যাহত রাখাটা দরকার বলে আমরা মনে করি।