কৃষকের ঘামে দেশের হাসি

কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ সাফল্য তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। যে দেশের কৃষি সব সময় শিরোনাম হয়েছে খরা, বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে, সেই দেশ আজ শিরোনাম হচ্ছে জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করে। খাদ্যশস্য আমদানিকারক দেশের তকমা বদলে নাম লিখিয়েছে রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়। শুধু ধান নয়, মাছ উৎপাদনও বেড়েছে দেশে। অথচ একপর্যায়ে প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বহু বছর ধরে চালু ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটিও মানুষ ভুলতে বসেছিল। আবার সেই মাছ ফিরে এসেছে বাঙালির পাতে। সবজি উৎপাদনেও পিছিয়ে নেই দেশ। কৃষিতে দেশের এই ব্যাপক সাফল্যের মূল নায়ক কৃষক। বিজ্ঞানীদের

উদ্ভাবিত ফসলের উন্নত জাত ও আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এ দেশের কৃষকরাই নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গতিশীল রেখেছেন উৎপাদন। শুধু উৎপাদনই নয়, খাদ্যশস্য সংরক্ষণেও এসেছে দারুণ পরিবর্তন।

এত সাফল্যের মধ্যেও বিষাদের বার্তা নিয়ে এসেছিল জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষক দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত তার স্বীকৃতিও মিলেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বছরে ধান উৎপাদন হয়েছিল প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টন। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর সেই ধান উৎপাদন তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৪৭ লাখ টনে। এই অসাধ্য সাধন করেছেন বাংলাদেশের কৃষকরা। নিজেদের গোলা ভরার পাশাপাশি দেশকেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন তাঁরা। তাঁদের দেওয়া শক্ত ভিতের ওপর আজ বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে। কৃষকের ঘামেই ঝিলিক দিচ্ছে বাংলাদেশের হাসি।

কৃষকদের সাফল্যের বন্দনা এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও তাদের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। আউশ আর আমন ধান বলতে আগে দেশে ধানের যেসব জাত ছিল সেসবের ফলন ছিল খুবই কম। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিল না এসব ধানের উৎপাদন। এর ফলে ক্ষুধা-দারিদ্র্য লেগেই ছিল। কিন্তু কৃষক দমে যাননি। বিজ্ঞানীদের গবেষণা, তাঁরা সৃজনশীলতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন মাঠে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের (ইরি ধান নামে পরিচিত) চাষ দেশে শুরু হওয়ার পর উৎপাদনে গতি আসতে শুরু করে। একপর্যায়ে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও উদ্ভাবন করতে শুরু করেন একের পর এক উফশী জাতের ধান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি কৃষকদের। শুধু ধান নয়, রবিশস্যেও এগিয়েছে দেশ। হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনেও মিলেছে আশাতীত সাফল্য। এসব সাফল্যের ওপর ভর করেই সম্প্রসারিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ।

কৃষিতে এই বিপ্লব কিভাবে ঘটেছে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষকরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই বদলিয়েছেন। তাঁদের ভাগ্য বদলে সহায়তা করেছে সরকারের কিছু নীতি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নীতি ছিল সার, ডিজেলসহ কৃষি উপকরণের দাম বাড়িয়ে কৃষকের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া। আর আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি হচ্ছে এসব উপকরণের দাম কমিয়ে কৃষকের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। বিএনপি আমলের ৭৫ টাকা কেজি দরের সার আমরা ২৫ টাকা দরে দিচ্ছি। আজ কৃষক যে এত ফসল ফলাচ্ছেন তার মূলে এসব পলিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কৃষক যে ইউরিয়া সার ব্যবহার করছেন তার কেজিপ্রতি দাম ১৪ টাকা। কিন্তু এই ইউরিয়া সারের আমদানি ব্যয় কেজিপ্রতি প্রায় ৩১ টাকা। কখনো কখনো এই ব্যয় ৫০ টাকায় দাঁড়ায়। শুধু ইউরিয়া নয় টিএসপি, এমওপি বা ডিএপি সব সারই বেশি দামে কিনে কম দামে কৃষকের কাছে বিক্রি করা হয়। এগুলোও সাফল্যের অন্যতম কারণ।’

কৃষক শুধু মোট উৎপাদনই বাড়ায়নি, তারা হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও বাড়িয়েছে। ১৯৭০-৭১ সালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৭৮৮ কেজি। ১৯৯০-৯১ সালে এসে তা এক হাজার ৭১১ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ২০০০-০১ সালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩২৩ কেজিতে। ২০১৪-১৫ সালে এই উৎপাদন দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৪১ কেজিতে। ধানের মতো গমের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। আলু, ভুট্টারও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে।

পেঁয়াজ, রসুন উৎপাদনেও এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১২-১৩ সালে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার টন। ২০১৩-১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ এক হাজার টনে। ২০১৪-১৫ সালে এসে তা দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৩০ হাজার টনে। পরের বছর তা আরো ২০ হাজার টন বাড়ে।

নদী দূষণ ও ভরাট হওয়ায় এবং খালবিল, হাওরসহ জলাশয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গিয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পিত মাছ চাষের কারণে বাঙালি আবারও মাছের স্বাদ ফিরে পেতে শুরু করেছে। উন্নত জাতের মাছ চাষে বাংলাদেশে বিপ্লব ঘটে গেছে। চাষি ও মত্স্যবিজ্ঞানীদের সম্মিলিত চেষ্টা মাছের উৎপাদন বাড়িয়েছে আর দাম স্থিতিশীল রেখেছে। মত্স্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। রুই, পাঙ্গাশ, কৈসহ বেশ কিছু মাছের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে। এসব কারণে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য হচ্ছে, ২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছের ভোগ ছিল ৪৮ গ্রাম। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ গ্রামে। ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষ করা মাছের উৎপাদন ছিল এক লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে এসে তা বেড়ে ছয় লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০১৫ সালে এসে তা ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১৪টি মাছের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং ৫০টি উন্নত প্রযুক্তি চাষিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। বিশ্বে মিষ্টি পানির মাছ উৎপাদনে শীর্ষে চীন। এরপরই আছে ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) মতে, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে পুকুরে মাছ চাষ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বাংলাদেশে।

এফএওর মতে, বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। একসময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই শুধু সবজি চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজি চাষ হয়। দেশের প্রায় দুই কোটি কৃষক পরিবারের প্রায় সবাই সবজি চাষ করে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সবজি উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি ভোগও বেড়েছে। গত এক যুগে দেশে সবজি উৎপাদন বেড়েছে ২৫ শতাংশ। সবজি রপ্তানিও বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এফএওর তথ্য মতে, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বাংলাদেশে। এ বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের পরই ৪.৯ শতাংশ হারে বেড়েছে নেপালে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ গ্রামে।

বাংলাদেশে কৃষির সাফল্যে কালো মেঘ হিসেবে এসেছিল জলবায়ু পরিবর্তনের বার্তা। সেখানেও সাফল্য দেখিয়েছে দেশের কৃষক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিভাবে পদ্ধতি বদলাতে হয় তারা তা দেখিয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক জায়গাই ফসলের মৌসুমে পানির নিচে থাকে। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর সেই জমিতে সবজি ফলাতে বেশ দেরি হয়ে যায়। বাংলাদেশের কৃষক এখন আর পানি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। তারা ভাসমান বেড বানিয়ে তার ওপর সবজি চাষ করে। গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলায় ভাসমান বেডে সবজি চাষ করা হচ্ছে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান বেডে সবজি চাষকে গুরুত্ব দিয়েছে এফএও। গত ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ভাসমান সবজি চাষকে গ্লোবালি ইম্পরটেন্ট অ্যাগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাসমান বেডে সবজি চাষের এ পদ্ধতি দেখার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে কৃষিবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে আসছেন।

কৃষির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ফসলের ভর মৌসুমে কৃষক ন্যায্য দাম পায়নি। আমন, বোরো, ইরি ধান কাটার সময় কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পর্যাপ্ত ধান হচ্ছে বলেই অভাব দূর হয়েছে। ধান না হলে অভাব থাকত। তিনি বলেন, ‘কৃষক দাম একটু কম পেলেও খেতে পারছে। না খেয়ে থাকতে হচ্ছে না। এখন যদি উৎপাদনই না হতো মানুষ খেত কী? পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ার সমস্যাটি সুখের অসুখ। অর্থাৎ এটি একটি মধুর সমস্যা।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ধান-চাল উৎপাদনে সরকারের নীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কী পলিসি নেয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের নীতি ছিল কম মজুদ করা। এ জন্য তারা মজুদ করার সুবিধা পায়নি, বরং হাতছাড়া করেছে। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার চট্টগ্রামের একটি বড় এরিয়া ছেড়ে দিয়েছিল। খাদ্য অধিদপ্তরের একটি জায়গা মাত্র এক টাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বেপজাকে। তখন মাত্র ১০ লাখ টন খাদ্য মজুদ করা হতো। কিন্তু ২০০৯ সালে সরকার পলিসি বদলে ফেলে। সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ৩০ লাখ টনের মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ কারণে অনেক দেনদরবার করার পর বেপজার কাছ থেকে জমি ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানে সরকার দেড় লাখ টন ধারণক্ষমতার একটি অত্যাধুনিক গুদাম নির্মাণ করেছে। বর্তমানে দেশের খাদ্যগুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ২২ লাখ টন।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু খাদ্য উৎপাদন করলেই হবে না। এসব খাদ্য মজুদও করতে হবে। কোনো একটি মৌসুমে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটতেই পারে। এ কারণে সরকার খাদ্য উৎপাদনের মতো মজুদকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ টনে উন্নীত হবে। বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে গুদামের মজুদ সুবিধা বাড়ানোর। যেন প্রয়োজনের সময় সরকার বাজারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাহলেই দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।