সরকারের ২ বছর সাফল্যই বেশি

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বহুদলীয় সরকারের আমলে গত দুই বছরে সারাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং উন্নত দেশগুলোও বাংলাদেশের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। শিক্ষার আধুনিকায় ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, কৃষি খাতে নীরব বিপ্লব ও উৎপাদন বৃদ্ধি, ফ্লাইওভার ও ব্রিজ নির্মাণ, সড়ক মহাসড়ক সংস্কার, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার উন্নয়নে সরকারের সাফল্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ বিভিন্ন খাতে।এছাড়া জনপ্রশাসনেও বড় ধরনের পদোন্নতি ও নানা রকম সংস্কার হয়েছে। তবে শিক্ষা ও জনপ্রশাসন খাত অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে।জনপ্রশাসনবিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরে গত দুই বছরের এক লাখ দশ হাজার ৫৮৫টি পদ সৃষ্টি, ৫৭ হাজার ৫৩২টি পদ সংরক্ষণ, ১১ হাজার ৩৬৫টি পদ স্থায়ীকরণ করা হয়েছে। পদ সৃষ্টির ফলে মানুষের কর্মস্থান হয়েছে, আর স্থায়ীকরণের ফলে কর্মকর্তাদের কাজের প্রতি মনোযোগ বেড়েছে। বিসিএস’র মাধ্যমে আট হাজার ৩১২ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং দুই হাজার ১৫৮ জনের নিয়োগের সুপারিশ এবং তিন হাজার ৯৮৩ জনের নিয়োগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।এছাড়াও গত বছরের ৬ এপ্রিল প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে ৮৭৩ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়, যা সরকারের একটি বড় সাফল্য। দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন। এসব কর্মকর্তা পদোন্নতি পাওয়ায় প্রশাসন গতিশীল হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।রাজনীতিতে সফলতার দুই বছরজাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার পর্যায়ের বিভিন্ন নির্বাচনের কর্মকা- নিয়ে কমবেশি বিতর্ক থাকলেও তা কাটিয়ে সরকারের অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমান সরকার এখন অনেকটাই স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। ২০১৫ সালের শুরুতে বিএনপির ডাকা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। নিহত হয় শতাধিক মানুষ। এতে রাজনৈতিকভাবে সরকারের মাঝে কিছুটা হতাশা এলেও পরবর্তীতে দক্ষতায় তা সামাল দেয়। রাজনীতিতে হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখা দিয়েছে বছর শেষে। নানা অভিযোগ অব্যাহত রাখলেও সিটি করপোরেশন এবং দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধীদলের অংশগ্রহণ সরকারের ভাবমূর্তিতে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।শিক্ষা এবং গণশিক্ষাএই সরকারের আমলে প্রায় আট হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, ইন্টারনেট মডেম ও সাউন্ড সিস্টেম এবং নানা রকম শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ হাজার ৪৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রায় আড়াই হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের নতুন শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।দুই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিট ভর্তির হার ৯৭ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে বর্তমানে ৯৯ শতাংশের বেশি শিশু বিদ্যালয়ের আওতায় এসেছে।এছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে গত দুই বছরে প্রায় এক হাজার ২০০টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাডেমিক ভবন নির্মাণ করেছে।যুদ্ধাপরাধের বিচারদেশীয়-আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের গতি অব্যাহত রাখায় নতুন সরকার গঠনের প্রথম বছরেই প্রশংসিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। দেশি-বিদেশি চাপ উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের বিষয়ে তারা অবহিত। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতের রায় কার্যকরে তার পাহাড় সমান দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তার ফলেই নানা চড়াই-উৎড়াই পার করে গত বছর তিন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর করে সরকার। এই দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি মামলায় রায় এসেছে আর চলমান রয়েছে আরও ১০টি মামলা।মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বৃদ্ধিএই সরকারের প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ছিল তিন হাজার টাকা করে। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে সরকার এই ভাতা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করে। গত বছরের জুন পর্যন্ত এই হারেই ভাতা পেতেন মুক্তিযোদ্ধারা। তবে জুলাই থেকে আরও তিন হাজার বাড়িয়ে অর্থাৎ আট হাজার টাকা করে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দিচ্ছে সরকার।সরকারের দ্বিতীয় বর্ষে আরও একটি বড় সাফল্য হলো বীরাঙ্গনাদের নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারা। তাদেরও মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই আট হাজার করে ভাতা দেয়া হচ্ছে।প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্যসরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের আকাশ সীমা রক্ষা ও শত্রুর মোকাবিলা করতে স্বল্পপাল্লার মিসাইল এবং স্বল্প ও দূরপাল্লার মিসাইলসহ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস উদ্বোধন, সেনাবাহিনীতে প্রথমবারের মতো নারী সৈনিক অন্তর্ভুক্তিকরণসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন করা হয়েছে। জলসীমা রক্ষায় নৌবাহিনীতে নতুন নৌ ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ ও হেলিকপ্টার নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে।অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীতে নতুন করে ৫০ হাজার জনবল নিয়োগ ও নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। আর দেশের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) আধুনিকায়ন করা হয়েছে। নতুন নতুন গোয়েন্দা ইউনিট, অপরাধী শনাক্তে আধুনিক নিরাপত্তার জাল তৈরি করা হয়েছে।গত ২৯ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস উদ্বোধন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণের ধারাবাহিকতায় আন্তর্ভুক্ত হয়েছে মেইন ব্যাটল ট্যাংক ২০০০ (এমবিটি-২০০০), ওয়েপন লোকেটিং রাডার এবং সেলফ প্রোপেলড গান’র মতো অতাধুনিক সমরাস্ত্র। প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীতে নারী সৈনিক অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে।বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করতে পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি ‘বঙ্গবন্ধু’ স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, জেট প্রশিক্ষণ বিমান, সর্বাধুনিক এভিওনিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তির পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমানসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।নদী ও সমুদ্র পথের নিরাপত্তায় নৌবাহিনীর জন্য পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় রাবনাবাদে এভিয়েশন সুবিধাসংবলিত নৌ ঘাঁটি বানৌজা শের-ই-বাংলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগৃহীত সর্ববৃহৎ যুদ্ধজাহাজ সমুদ্র জয়সহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ, দুটি হেলিকপ্টার ও দুটি মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট বহরে যুক্ত হয়েছে। সীমান্তের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিদ্যমান ৫২৭টি বর্ডার অপারেশন পোস্ট (বিওপি)-এর অতিরিক্ত ৮০টি বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে।সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্ত্রাস দমন করছে। কেরানীগঞ্জে নবনির্মিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাবসহ বিশেষায়িত অন্যান্য ইউনিটগুলো জঙ্গিবাদ দমনে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে শেখ হাসিনার সরকার সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগ করছে। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।স্বাস্থ্য খাতে সাফল্যদুই বছরে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়েছে, যা বিশ্ব দরবারেও প্রশংসিত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর ৭ মাসে উন্নীত হয়েছে। মাতৃমৃত্যু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমে প্রতি লাখে ১৭০ জনে এবং অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুর হার কমে প্রতি হাজারে ৪১ জনে দাঁড়িয়েছে।২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে সনদ পায় বাংলাদেশ। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গত দুই বছরে ছয় হাজার তিনশ চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেড়েছে হাসপাতাল ও হাসপাতালের বেড সংখ্যা। পাঁচটি আর্মি মেডিকেল কলেজসহ ১২টি সরকারি মেডিকেলে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বেড সংখ্যা বেড়েছে ৪০টি হাসপাতালের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত অটিজম ও স্নায়ু বিকাশজনিত প্রস্তাবনাও পাস হয়েছে।পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসসহ একাধিক মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু মাধ্যমে সারাদেশে শক্তিশালী সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি এবং রাজধানীকে যানজটমুক্ত করার সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে প্রাথমিক সফলতার অর্জন করেছে গত দুই বছরে। যা গত ৫ বছরের সম্ভব হয়নি। টেকসই, নিরাপদ ও মানসম্মত মহাসড়ক এবং সমন্বিত আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিশন বাস্তবায়নের সরকারের সড়ক, সেতু, রেল, নৌ ও স্থানীয় যোগাযোগ সেক্টরগুলো অনেকটাই আন্তরিক ২০১৪-১৫ বছরে।বিদ্যুতে অগ্রগতি দৃশ্যমান-জ্বালানিতে ধীরগতিবিদ্যুৎ খাতে গত দুই বছরে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তবে জ্বালানি খাত চলছে ধীরগতিতে। বিদ্যুৎ খাতে মাতারবাড়ি, রামপাল, পায়রা বন্দরসহ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অগ্রগতি হয়েছে। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ চুরি কমেছে। বায়ু বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও জলবিদ্যুতে তেমন অগ্রগতি নেই। তবে সৌরবিদ্যুতে অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। সঞ্চালন খাতের উন্নয়নে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সমুদ্র বিজয়ের পরও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয় চলছে ধীরগতিতে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের হিড়িক পড়েছে; নিয়ন্ত্রণহীন সরকার। টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র বিস্ফোরণে নাইকোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে কোন সমাধান হয়নি। নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারে সাফল্য নেই। গত দুই বছরে গ্যসের উৎপাদন (বর্তমান উৎপাদন ২৭০ এমএমসিএফ) কিছুটা বেড়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গ্যাসের উৎপাদন বাড়েনি। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) আমদানির বিষয়টিও চলছে ধীরগতিতে। এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতে নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। এলপিজি সহজলভ্য করে আবাসিক খাতে এর ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।সড়ক ও যোগাযোগগত দুই বছরে সড়ক ও যোগাযোগ সেক্টরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয়া। ঢাকার যানজট নিরসনে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৬ বা মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এডিবির অর্থায়নে গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) এলাইনমেন্ট, বিস্তারিত নকশা ও প্রয়োজনীয় সকল সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী টানেল। জি-টু-জি ভিত্তিতে টানেল নির্মাণে চীন সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েহজরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত পিপিপিভিত্তিক ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ২য় কাঁচপুর, ২য় মেঘনা ও ২য় গোমতী সেতু নির্মাণ প্রকল্প, সিলেটে সুরমা নদীর উপর কাজীর বাজার সেতু, মাদারীপুরে ৭ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, শেখ রাসেল সেতু, সুনামগঞ্জে সুরমা সেতু, বিরুলিয়া-আশুলিয়া সড়কে বিরুলিয়া সেতু, আড়িয়াল খাঁ সেতু, পুরাতন ব্রাহ্মপুত্র সেতু, কলাতলী সেতু, বাটাখালী সেতু, ঘাঘট সেতু, মেলান্দহ সেতু, পয়সার হাট সেতু, তালতলী সেতুসহ বেশকিছু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রায় ১২শ কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (ইবিবিআইপি) আওতায় ১১২টি সেতুর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে।অর্থনীতিতে সাফল্যগত ২ বছরের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। উক্ত সময়ে যে অগ্রগতি ও উন্নতি সাধিত হয়েছে তা ইতোপূর্বে কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এ সময়ে জিডিপি, রিজার্ভ, মানবসম্পদ খাতে উন্নয়ন, কৃষি খাতের অগ্রগতি, বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪ ধাপ এগিয়েছে, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ, রপ্তানি আয়, মূল্যস্ফীতি ছিল নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে বারবার হোঁচট খেলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। বিশ্ব মন্দার মধ্যে বাংলাদেশের গত ৫-৬ বছর ধরে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে গড় বৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির মন্দার পরিবেশ থাকার পরও বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধির হার বিস্মিত করেছে অর্থনীতিবিদদের।২০১১ সাল থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বর ২০১৪ এবং জুন ২০১৫-তে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। নভেম্বর ২০১৫ সালে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মূল্যস্ফীতির এই হারকে সহনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।রপ্তানি আয়েও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন। বর্তমান সরকারের আমলে রেমিটেন্স প্রবাহেও এসেছে উল্লেখযোগ্য গতি। গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। আর রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার।দারিদ্র্য হার হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়নগত দুই বছরে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি মানব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশটির অগ্রগতি হচ্ছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্য কমে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। ২০১০ সালে আরও কমে হয় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আর অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ধারাবাহিক এই অগ্রগতি বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কম গৌরবের নয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ যে অতি দরিদ্রতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, তাদের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে_ তা যথেষ্ট ইতিবাচক দিক। বর্তমানে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। গতবার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩তম।কৃষিবরাবরের মতো অর্থনীতিতে সুখকর অবস্থা তৈরির ভিত মজবুত করে চলেছে কৃষি। ফসল উৎপাদন এবং কৃষির বিভিন্ন খাত-উপখাত সবখানেই ভালো করেছে বাংলাদেশ। মাছ উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে চতুর্থ স্থান অর্জনের সুখবর এসেছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও থেকে। এফএও বলছে, চাল-গম মিলে উৎপাদন হতে পারে ৫ কোটি ৬ কোটি টন। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন দেশের কৃষক। গত বছর ৫০ হাজার মেট্রিকটন চাল রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।