ফিরিয়ে আনা হবে পাটের গৌরব

হকিকত জাহান হকি ও ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
খসড়া পাটনীতি, ২০১৬ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগির নয়া পাটনীতির খসড়া মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। এতে পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, পণ্য বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পাটের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য সামনে রেখে এই নীতি চূড়ান্ত করা হবে। এর মাধ্যমে পাট খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সূত্র জানায়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবার দেশ-বিদেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতে এরই মধ্যে খসড়া পাটনীতি তৈরি করেছে। এতে সরকারি-বেসরকারি খাতে পাটশিল্পকে জোরদার করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাটশিল্পের বিকাশের কারণে এ দেশ একসময় প্রাচ্যের ড্যান্ডি হিসেবে খ্যাত ছিল। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সমকালকে বলেন, পাটের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পাটনীতি, ২০১৬ প্রণয়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটকে জনপ্রিয় করা, পাটের উৎপাদন বাড়ানো এবং এ নীতিমালায় শিল্পায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
মির্জা আজম বলেন, পাটের আন্তর্জাতিক বাজার ভালো না থাকলে দেশের পাটচাষি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অবস্থা ভালো থাকে না। এ কারণে অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমে পাটের ২৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষক যাতে পাটের ন্যায্যমূল্য পান, সেটাও নিশ্চিত করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ বাজারের স্বার্থে সরকার যে কোনো সময় পচা পাট রফতানি বন্ধ করতে পারে।
পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ২০১১ সালে প্রণীত পাটনীতিতে অভ্যন্তরীণ পাটের উৎপাদন ও শিল্পায়নের ওপর প্রাধান্য
দেওয়া হলেও এবারের পাটনীতিতে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত পাটনীতিতে সুযোগ রাখা হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের। সরকারের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ জড়িত রয়েছে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পাট ব্যবসায়ী মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, পাটজাত পণ্য বহুমুখী করতে সরকারকে সক্রিয় সহায়তা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে জোর দিতে হবে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর। তিনি আরও বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পাটের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মার খাবে। ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে। যে কোনো উপায়ে অব্যাহত রাখতে হবে রফতানি প্রক্রিয়া।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রচার ও নতুন বাজার খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা নেওয়া হবে বিদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোর। রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে উৎসাহ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। বাজার সম্প্রসারণে গঠন করা হবে রফতানি সহযোগিতা সেল। পাটজাত পণ্যের ওপর নির্মাণ করা হবে বিশেষ তথ্যচিত্র। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নিয়ে বিদেশি প্রচারে অংশ নেওয়া এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা হবে।
সূত্র জানায়, বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রসার ঘটাতে নতুন নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ডিজাইন ইনস্টিটিউট ও ডিজাইন সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে নতুন শিল্প গড়ে তোলা ও পুরনো শিল্প আধুনিকীকায়নে কম সুদে ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের। কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে এ খাতে দেওয়া হবে সব ধরনের সহায়তা ও সুযোগ।
জানা গেছে, উচ্চ ফলনশীল পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নত পদ্ধতিতে পাট চাষ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে কৃষকদের। সংরক্ষণ করা হবে পাট চাষযোগ্য ভূমি। পাটের নতুন জাত উদ্ভাবন করা হবে বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নত জাতের পাটবীজ, সার, কীটনাশক, অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরকারিভাবে সরবরাহ করা হবে কৃষকদের।
পাটশিল্প উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকারি পাটকলগুলোর অব্যবহৃত জমি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে পাট অধিদপ্তরে একটি বিনিয়োগ সহায়তা সেল গঠন করা হবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, মৌসুমের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার করে পাটের নূ্যনতম মূল্য ঘোষণা করবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পাট উৎপাদন জেলাগুলোতে ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। কেন্দ্রগুলোতে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। কৃষকদের ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে পাটচাষি সমবায় সমিতি গঠনে সহায়তা দেওয়া হবে।
আইন অনুযায়ী ছয়টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের তৈরি ব্যাগ বা পাটের তৈরি অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন, ২০১০ অনুযায়ী এটা নিশ্চিত করা হবে। আইন বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। শিল্প ও কলকারখানায় বোতল প্যাকেট প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক, সিনথেটিক ব্যাগ কনটেইনারের পরিবর্তে পাটের ব্যাগের প্রচলন করা হবে। বাংলাদেশের বহুমুখী পাটপণ্যের সৃষ্টি করা হবে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড।
খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়, পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাটজাত পণ্য ও পাটপ্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। একটি পরিপূর্ণ ডিজাইন ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে এ খাতে নতুন নতুন ধারণার উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হবে। পাটকলগুলোতে নিয়োজিত শ্রমিক, টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ। এ খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পাটপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী তৈরির লক্ষ্যে ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি কোর্স চালু করা হবে।