নাসায় বাংলাদেশি গবেষকের সাফল্য (ভিডিও সহ)

ইটা কারিনার মতো বিশাল নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে মিল্কিওয়ের বাইরের গ্যালাক্সিগুলোতে। গ্যালাক্সিগুলো হচ্ছে এনজিসি ৬৯৪৬, এম১০১, এম৫১ এবং এম৮৩। এগুলোতে ইটা কারিনা যমজের মতোই পাঁচটি নতুন ভারী বিশালাকায় নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারী নক্ষত্রগুলোর পরিণতির ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এতদিন নিশ্চিত ছিলেন না। এই আবিষ্কার ভারী নক্ষত্রগুলোর পরিণতির ব্যাপারে গবেষণায় নতুন আলো ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশি গবেষক রুবাব খানের নেতৃত্বে একটি দল পাঁচ নক্ষত্রের সন্ধান পায়। রুবাব মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডবি্লউএসটি) ফেলো। এ পর্যন্ত তিনি ৩৫টি গবেষণাপত্র লিখেছেন। এর মধ্যে ৯টিতে প্রধান লেখক হিসেবে আছেন। তিনি হাবল, স্পিটজার, হার্শেল স্পেস টেলিস্কোপ ডাটার আলোকমতি এবং বহু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য-সংক্রান্ত গবেষণায় জড়িত থেকেছেন। রুবাবের বর্তমান গবেষণার ক্ষেত্র হলো বেশি বয়সের এবং বেশি ভরের নক্ষত্রের পরিণতি।
২০০৪ সালে তিনি বৃত্তি পেয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে ২০০৮ সালে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে তিনি গ্র্যাজুয়েট করেন। ২০১৪ সালে ওহিও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন অ্যাস্ট্রোনোমিতে। ওহিও বিশ্বদ্যিালয়ের অধ্যাপক করজিসটফ স্টানেক এবং ক্রিস্টোফার কোচানেকের অধীনে তিনি কাজ করেছেন।
রুবাব খান জানিয়েছেন, ভারী নক্ষত্র নিয়ে তার গবেষণা নক্ষত্রের পরিণতি নিয়ে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে। সূর্য বা সূর্যের মতো নক্ষত্রের আয়তন পৃথিবীর প্রায় ১৩ লাখ গুণ বেশি। তবে এমন নক্ষত্রও আছে, যা শত সূর্যের চেয়েও বড়। কিরণ দেয় সূর্যের চেয়ে ৫০ লাখ গুণ বেশি। এ ধরনের বিশালাকায় ভারী নক্ষত্রগুলো সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়।
এগুলো উদ্গিরণ করে কার্বন, অক্সিজেন, লোহার মতো ভারী মৌলিক উপাদান।
তবে এই বিশাল নক্ষত্রগুলো খুবই দুর্লভ। আকৃতি অনুযায়ী এগুলো খুবই অস্থির। নাসা মনে করে ইটা কারিনা হলো সেই বিশেষ ধরনের নক্ষত্র, যা বিস্ফোরিত ছিল না। ইটা কারিনা মূলত দুটি নক্ষত্র নিয়ে গঠিত একটি বাইনারি ব্যবস্থা। বৃহত্তরটি হলো ইটা কারিনা ‘এ’, সূর্যের চেয়ে ১০০ থেকে ১৫০ গুণ বেশি ভরসম্পন্ন। এবং ছোটটি হলো ইটা কারিনা ‘বি’, সূর্যের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি ভারী। ১৮৩৮ সালে ইটা কারিনা মহাকাশে সূর্যের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভরসম্পন্ন পদার্থ নির্গত করেছিল। ১০ বছর ধরে চলা নক্ষত্রের এই উদ্গিরণ এটিকে কিছু সময়ের জন্য আকাশের দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম বস্তুতে পরিণত করেছিল। উজ্জ্বলতার দিক থেকে সাদা বামন সাইরাসের পরই ছিল এর অবস্থান।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৫০০ আলোকবর্ষ দূরে দক্ষিণ জ্যোতিষ্কপুঞ্জে অবস্থিত ইটা কারিনাকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়। তারপরও কেউ জানতে পারেননি কেন ইটা কারিনা থেকে পদার্থ নির্গত হয়। বিজ্ঞানীদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় ইটা কারিনাকে ঘিরে আরও অনুসন্ধান। স্পষ্টভাবে নক্ষত্রের পরিণতি বোঝার জন্যও তা জরুরি ছিল।
২৯ গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী রুবাব খান এ ব্যাপারে বাঁক ঘোরানোর মতো কাজ করে ফেললেন। রুবাবের নেতৃত্বে গবেষণা দল পাঁচটি অতিভরের নক্ষত্রের সন্ধান পেল যেগুলো ইটা কারিনার মতোই ভর ও আকৃতির। এগুলো দেড় কোটি থেকে আড়াই কোটিরও বেশি আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত গ্যালাক্সিগুলোতে পাওয়া গেছে।
গত ৬ জানুয়ারি আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল সোসাইটির বার্ষিক সভায় রুবাব খান পাঁচটি নক্ষত্র আবিষ্কারের কথা উত্থাপন করেন। এগুলোকে শনাক্ত করার জন্য তারা হাবল মহাকাশ টেলিস্কোপ এবং নাসার স্পেস স্পিটজার সাহায্য নিয়েছিলেন। রুবাব বলেছেন, আরও ভালোভাবে ভারী নক্ষত্রগুলোর বিবর্তন বোঝার জন্য এবং সব ধরনের মৌলিক পদার্থ ও ধূলিকণা তৈরির প্রক্রিয়া বোঝার জন্য এ থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।
স্কট অ্যাডাম ও ক্রিস্টোফার কোচানেকের সঙ্গে কাজ করে রুবাব মূলত এক ধরনের আলোক ও অবলোহিত আলোর ফিঙ্গার প্রিন্ট তৈরি করেন। যাতে এগুলো ব্যবহার করে তারা ইটার মতো নক্ষত্রগুলোর সন্ধান করতে পারেন। নাসার ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, রুবাব ও তার দলের সদস্যরা ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোট সাতটি গ্যালাক্সি জরিপ করে দেখেন। ২০১৫ সালে আরেকটি জরিপে তারা এম ৮৩ গ্যালাক্সিতে ইটা কারিনার মতো দুটি নক্ষত্র দেখতে পান। এই নক্ষত্র দুটি পৃথিবী থেকে দেড় কোটি আলোকবর্ষ দূরে। এ ছাড়াও এনজিসি ৬৯৪৬, এম১০১ এবং এম৫১ গ্যালাক্সিতেও এমন নক্ষত্রের সন্ধান পান। এগুলো সূর্য থেকে যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত। রুবাবের এই গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারী নক্ষত্রগুলো একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলে কি-না?
রুবাব খানের বড় বোন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া ফারাহ খান বলেছেন, ‘প্রত্যেকের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শৈশব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। তবে রুবাবের জীবন ঘুরে গিয়েছিল তার ইচ্ছাশক্তির কারণে। শৈশব থেকে সে স্বপ্ন দেখেছিল। সে প্রায়ই দাদার টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করত এবং তা মিলিয়ে দেখত বইয়ের ছবির সঙ্গে। সে সব সময় চেয়েছিল নভোচারী হতে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘সাধারণত মানুষ পিএইচডি থিসিস উৎসর্গ করে পিতা-মাতাকে। তবে রুবাব তা করেনি। সে উৎসর্গ করেছে বাংলাদেশকে। রুবাব তার এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেছে উদয়ন স্কুল এবং নটর ডেম কলেজ থেকে। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ই সে সিদ্ধান্ত নেয় নভোচারী হবে এবং সব সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই নিয়ে ব্যস্ত থাকত।’
রুবাবের বাবা অধ্যাপক নুরুর রহমান খান ও মা অধ্যাপক ফিকরিয়া বেগম জানিয়েছেন, রুবাবের এই সাফল্য তাদের খুব আনন্দিত করেছে। রুবাব শিশুকাল থেকেই মহাকাশ সম্পর্কে খুবই আগ্রহী ছিল।