সবচেয়ে আশাবাদের দেশ বাংলাদেশ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর দৈনন্দিন জীবনের টানাপড়েন— এতসব বিপত্তির পরও আশাবাদী বাংলাদেশের মানুষ। আগামীতে সুদিন আসছে— এমন আশায় বিশ্বাস রাখছে তারা। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী দেশের তকমা এখন বাংলাদেশের। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের ৮১ শতাংশ মানুষের প্রত্যাশা, ২০১৬ সালে তাদের জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। ৭ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে নৈরাশ্যবাদী। জরিপে অংশ নেয়া ১১ শতাংশ মানুষ মনে করছে, তাদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন এ বছরে ঘটবে না। আর ২ শতাংশ মানুষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে ৭৪ শতাংশ বাংলাদেশী চলতি বছর উন্নত ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। তাদের এ আশাবাদ গ্যালাপের সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ আশাবাদী দেশের তালিকায় প্রথম স্থানটি নিশ্চিত করেছে।

তিনটি আলাদা সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি আশাবাদী ও শীর্ষ ১০টি নৈরাশ্যবাদী দেশের তালিকা করা হয়েছে। আশাবাদ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সুখ— এ তিন সূচক এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়। বিশ্বব্যাপী ৬৬ হাজার ৪০ জন মানুষের ওপর জরিপটি চালিয়েছে গ্যালাপ। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষের সাক্ষাত্কার নিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে তথ্য। গত বছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আর প্রাপ্ত এ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে উইন-গ্যালাপ।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, একটি দেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার পেছনে যেসব বিষয় কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম বড় স্বপ্ন দেখা এবং তার বাস্তবায়ন। এক দশক আগেও দেশের মানুষ যেসব বিষয় কল্পনাও করতে পারত না, এখন সেগুলো বাস্তবে প্রত্যক্ষ করছে। এর পাশাপাশি সরকার নিজস্ব অর্থায়নে অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহস দেখিয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের মনে। এর সঙ্গে যে বিষয় কাজ করছে তা হলো, আমাদের জাতীয়তাবোধ ধীরে ধীরে আরো সুসংহত হচ্ছে।

আশাবাদ সূচকে বাংলাদেশের পরের স্থানগুলোয় রয়েছে যথাক্রমে চীন (৭০ শতাংশ), নাইজেরিয়া (৬৮ শতাংশ), ফিজি (৬১ শতাংশ), মরক্কো (৫৭ শতাংশ), সৌদি আরব (৫৬ শতাংশ), ভিয়েতনাম (৫৫ শতাংশ), আর্জেন্টিনা (৫৩ শতাংশ), ভারত (৪৭ শতাংশ) ও পাকিস্তান (৪২ শতাংশ)।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে আশাবাদী দেশের তালিকায়ও রয়েছে বাংলাদেশ। এ দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তালিকায় ৬১ শতাংশ আশাবাদী মানুষ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নাইজেরিয়া। আর বাংলাদেশের পরের স্থানগুলোয় রয়েছে যথাক্রমে চীন (৫৪ শতাংশ), ভিয়েতনাম (৫৩ শতাংশ), পাকিস্তান (৫০ শতাংশ), ভারত (৪৪ শতাংশ), মরক্কো (৪৪ শতাংশ), ফিজি (৩৯ শতাংশ), সৌদি আরব (৩২ শতাংশ) ও আর্জেন্টিনা (২৮ শতাংশ)।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হলো, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আকাঙ্ক্ষার বিপ্লব। কোনো মানুষ এখন আর শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চায় না। তার ব্যক্তিত্বের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় আশাবাদের মাধ্যমে। তবে এ আশাবাদ তার প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন নয়। আসলে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের মানুষ এখন আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। আর এ আশাবাদগুলোরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আলোচ্য প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সুখী দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে কলম্বিয়া (৮৫ শতাংশ)। এর পরের দুই স্থানে ফিজি (৮২ শতাংশ) ও সৌদি আরব (৮২ শতাংশ)। এ তালিকায় বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের সুখী মনে করে।

এদিকে প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে নৈরাশ্যবাদী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইতালির নাম। দেশটির ৩৭ শতাংশ মানুষ এমন ধারণা পোষণ করছে। এ তালিকায় ইতালির পরের স্থানগুলোয় রয়েছে যথাক্রমে ইরাক (৩৫ শতাংশ), গ্রিস (২৮ শতাংশ), ফিলিস্তিন (২৭ শতাংশ), বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (২৩ শতাংশ), লেবানন (২০ শতাংশ), তিউনিসিয়া (১২ শতাংশ), আফগানিস্তান (১১ শতাংশ), বেলজিয়াম (১১ শতাংশ) ও মেক্সিকো (১১ শতাংশ)।

এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে নৈরাশ্যবাদী দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে গ্রিস। দেশটির ৬৫ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে হতাশ। অস্ট্রিয়া (৪৯ শতাংশ) ও ইতালি (৪৭ শতাংশ) রয়েছে এ তালিকার শীর্ষ তিনে।

বিশ্বের সবচেয়ে অসুখী দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইরাকের নাম। এছাড়া তিউনিসিয়া, গ্রিস, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, ঘানা, হংকং, বুলগেরিয়া, ডিআর কঙ্গো, ফ্রান্স ও ইতালি অসুখী দেশের শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন ড. হামিদা হোসেন বলেন, কোন শ্রেণীর মানুষের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে, ফলাফলের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকে। কোনো একটি বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে সব শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৬৬ শতাংশ মানুষ তাদের জীবন নিয়ে সুখী। তবে ২০১৪ সালের তুলনায় এটি কিছুটা কমেছে। ২০১৪ সালে ৭০ শতাংশ মানুষ জীবন নিয়ে সুখী ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক সুখী মানুষের হার ৫৬ শতাংশ। বিশ্বের ৪৫ শতাংশ মানুষ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আশাবাদী। ২২ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে নৈরাশ্যবাদী। আর ২৮ শতাংশ মানুষ মনে করছে, এ অবস্থা আগামীতেও একই থাকবে।

গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, কোনো জরিপের ফলাফলই শতভাগ নির্ভুল নয়, তবে একটি ধারণা পাওয়া যায়। শত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ যে আশাবাদী, তা জানার জন্য কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না। সুশাসনের অভাবে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা যে দেখা যায় না, তা নয়, তবে এ দেশের মানুষ আশাবাদী বলেই বিভিন্ন বিপদ ও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে আগামী বছরগুলো কী কারণে ভালো যাবে, তার জবাব কোনো জরিপের ফলাফল দিতে পারবে না। তবে বাংলাদেশের মানুষ আশা নিয়ে না বাঁচলে একাত্তরে জয়লাভ করতে পারত না।