মসুর চাষে অনেক লাভ

যেদিকে চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় দুলছে গাছ। বলছিলাম মেহেরপুরের মসুর ক্ষেতের কথা। এ বছর এখানে গেল বারের তুলনায় দ্বিগুণ জমিতে এ ফসল চাষ হয়েছে। কয়েক বছরের বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় এবারও চাষিরা কোমর বেঁধে লেগেছেন মসুর আবাদে। তারা বলছেন, অন্য যে কোনো ফসলের তুলনায় এ ফসলে অনেক বেশি লাভ।

সদর উপজেলার টুঙ্গী গ্রামের প্রভাষক আসকার আলী এ মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে মসুর আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ধান আবাদে খরচ বেশি হলেও কাক্সিক্ষত দাম মেলে না। গেল বছর তার পাশের জমিতে যারা মসুর আবাদ করেছিলেন, তারা ভালো ফলনের পাশাপাশি চড়া দাম পেয়ে লাভবান হয়েছেন। তাই এবার ধানের পরিবর্তে তিনি মসুর আবাদ করেছেন। বিভিন্ন গ্রামের চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য ফসলের চেয়ে মসুর আবাদে খরচ একেবারেই কম। তাই প্রান্তিক দরিদ্র চাষিদের পক্ষে সহজেই মসুর আবাদ করা সম্ভব হয়। প্রতি বিঘা ধান আবাদে যেখানে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে মসুর আবাদে খরচ মাত্র ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে বিঘায় কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা লাভ আসে। অন্যদিকে মসুর আবাদে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন মাস। এর পরই পাট কিংবা অন্যান্য ফসল সহজেই আবাদ করা যায়। তবে ক্ষেতে মসুর বপনের সময় বীজের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন চাষিরা। তারা আরও বলেন, বীজের ব্যাপক চাহিদার কারণে ওই সময় ভেজাল ও নিবন্ধহীন বীজ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব মতে, গেল রবি মৌসুমে জেলা সদর, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলায় ৬ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে মসুর আবাদ হয়েছিল। এবার আবাদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৪৫ হেক্টর। গেল বছর বারি জাতের মসুরের গড় ফলন হয়েছিল ৮ মণ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত। ফসল তোলার সময় প্রতি মণ মসুর ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও পর্যায়ক্রমে সে দর গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বতমানে বাজারে প্রতি মণ মসুর সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপপরিচালক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কয়েক বছর আগে থেকে দেশ থেকে মসুর চাষ উঠে যাচ্ছিল। সনাতন জাতের মসুর চাষে ফলন এতটাই কম ছিল যে, চাষিদের আবাদ খরচই ওঠানো সম্ভব ছিল না। তবে বছর পাঁচেক আগে মসুর চাষের ধারণা পাল্টে দেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিউট উদ্ভাবিত জাতের মসুর। প্রথম দিকে চাষিদের মসুর আবাদে অনীহা থাকলেও বছরের পর বছর বাম্পার ফলন ও নায্যমূল্য পেয়ে চাষিরা মসুর চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রতি বছরই বারী মসুর জাতের উন্নয়নও ঘটাচ্ছে। প্রথম বছরে বারী-১ দিয়ে চাষ শুরু হলেও জাত উন্নয়নে এখন বারী-৭ এ পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, মেহেরপুর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান মসুর চাষের জন্য উপযোগী। তাই এ জেলায় উৎপাদিত মসুর জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় সরবরাহ হয়। এতে দেশের ডালের চাহিদায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখে মেহেরপুর জেলা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গেল বছরের মতো এবারও মসুরের বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। সে লক্ষ্যে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেয়া হচ্ছে।