বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে

বর্তমান সরকারের বিগত দুই বছরে বড় মাপের বেশকিছু অর্জন ও কৃতিত্ব লক্ষণীয়; আর লক্ষণীয় কিছু ছোট আকারের সীমাবদ্ধতা। বড় মাপের অর্জনগুলো খুব সহজেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটি আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে।

প্রথমেই যে অর্জনটি আমাদের নজর কাড়ে তা হলো, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা বিরোধের আন্তর্জাতিক আইনি নিষ্পত্তি। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছিল সরকারের বিগত মেয়াদে, আর ভারতের সঙ্গে হয় বর্তমান মেয়াদে। সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দেশটির জন্যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, উভয় সাফল্যই নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত কূটনৈতিক প্রস্তুতির কারণে। আর এজন্য বিশেষ করে ধন্যবাদ দিতে হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট অণু বিভাগের কর্ণধার রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম, যার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফসল হিসাবে বাংলাদেশ যে আইনি নথিপত্র তৈরি করেছিল তাতে ছিল অকাট্য যুক্তি ও তত্ত্ব-প্রমাণ। সুতরাং আন্তর্জাতিক আদালতে দেশের দাবি প্রমাণ করা বেশ সহজ হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে এধরনের পূর্ব প্রস্তুতিগুলোর উদ্যোগ থাকলে যেকোনো নীতি বা কর্ম বাস্তবায়নে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন উদ্যোগ আমরা সবক্ষেত্রে লক্ষ্য করি না।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। আমরা জানি স্বাধীন দেশ হিসাবে যাত্রা শুরুর লগ্নে দেশটির ভাগ্যে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসাবে একটি অভিধা জুটেছিল। আর মাত্র সাড়ে চার দশকের মধ্যে দেশটির জন্য এমন স্বীকৃতি যথেষ্ট গর্বের বিষয়। এই স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে বর্তমান সরকারের দিক-নির্দেশক ভূমিকা যেমন কৃতিত্বের দাবিদার তেমনি স্বীকৃত হতে হবে জনগণের অবদান। বাংলাদেশের মানুষ যে শুধু সংখ্যাধিক্যের পরিচিত তা নয়, তারা যে অর্থনৈতিক প্রগতিতে সুনিশ্চিত অবদান রাখতে পারে তা এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ কৃষিখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থাত্ কৃষিখাতে এখন রপ্তানিযোগ্য খাদ্য উত্পাদিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার কৃতিত্বের দাবিদার হলেও মূল অবদান আমাদের পরিশ্রমী কৃষককুলের। এক সময় এদেশে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল, কিন্তু এখন আশংকা যে সম্পূর্ণ তিরোহিত তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখা যায়, ১৯২১-এ তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়েছিল; কিন্তু ১৯২৮-এর মধ্যেই দেশটি খাদ্য উদ্বৃত্তের জনপদে পরিণত হয়েছিল। এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষি সাফল্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি কাজ দৃষ্টান্তমূলক, তা হলো স্কুল শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে বই বিতরণ। বছরের পয়লা দিনেই প্রায় তেত্রিশ কোটি বই উত্সবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া, যার নজীর বিশ্বের আর কোনো দেশেই নেই। অবশ্য প্রশ্ন ওঠে বইগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে। কিন্তু কথা হলো, এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ সরকারের সফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার কৃতিত্ব ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অন্যদিকে ত্রুটি-বিচ্যুতিও সারিয়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। নইলে শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের স্বপ্নের সেতু। এতো বিশাল একটি প্রকল্প বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে বিশ্ব ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। কিন্তু কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যে নাটক করেছিল তার সময়োচিত জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশকে কেউ এখন আর অবহেলা করতে পারবে না। পদ্মা সেতু নির্মাণ বর্তমান সরকারের জন্যে ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, চ্যালেঞ্জটি সফল ও দৃষ্টান্তমূলকভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার স্বাধীনতার পর-পরই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল কিন্তু; ১৯৭৫-এর পর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যদিকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা হয়। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে অর্থাত্ ২০১০ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নতুন করে শুরু করা হয়, যা দ্বিতীয় মেয়াদেও চলমান আছে। চলমান এই বিচার প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত চার জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বয়সের বিবেচনায় রাজাকার কুল শিরোমণি গোলাম আজমের দণ্ড দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। দণ্ড ভোগরত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০০৮-এর নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; সরকার যে সফলভাবেই এই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। তার জন্য জাতির কৃতজ্ঞতা। বিলম্বিত হলেও ন্যায়বিচার যে হয় তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ তৈরি করেছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই বিচার প্রক্রিয়া।

সরকারের এমন সব মোটা দাগের সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ্য। বিশেষ করে সুশাসনকে ঘিরেই জনগণের প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু সামগ্রিক দৃশ্যপট বলে দেয় এই সুশাসন এখনো অধরা রয়ে গেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময় মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের নানাবিধ অপকর্ম, যা সুশাসনকে বিঘ্নিত করার পাশাপাশি দল হিসাবে আওয়ামী লীগেরও ভাবমূর্তি বিপন্ন করেছে। সরকারের বর্তমান মেয়াদে ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ ও অসহিষ্ণুতা ভয়ানকভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ব্লগার ও মুক্তমনা প্রগতিশীল মানুষদেরকে হত্যা করা হয়েছে, বেঁচে থাকা অনেক মানুষকে হত্যারও হুমকি দেয়া হয়েছে। মন্দির, মসজিদ, গির্জা আক্রান্ত হয়েছে, আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছে বিদেশি নাগরিক। এ ধরনের ভয়ঙ্কর সব কর্মকাণ্ডের কোনো কিনারা করা আজও সম্ভব হয়নি। আর এসব কিছুই যে সুশাসনের অভাবে ঘটেছে তা বলা চলে। অবশ্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। কিন্তু সুশাসন থাকলে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রই সুযোগ পেতো না।

বর্তমান সরকারের বিগত দু’বছরের সূচনা হয়েছিল ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল এ কারণে যে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বা বিশ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করেনি, কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প ছিল না। কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়, ধরে-বেঁধে সবাইকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো। সুতরাং, নির্বাচনটি অনিবার্য ছিল। তবে নির্বাচন পরবর্তী বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জই ছিল সুশাসন নিশ্চিত করা, যাতে সীমাবদ্ধতা লক্ষণীয়। আর সর্বসাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ হলো জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করা।

[লেখক: ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।]