সিলেটে শিশু রাজন হত্যা: পার পায়নি ঘুষখোর পুলিশ

বয়স সবে ১৩ বছর ছুঁয়েছিল। এই বয়সী শিশুরা সকাল হলে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলমুখী হয়, বিকেলে খেলতে ছোটে মাঠে। রাজনের বেলায়ও তেমন হতে পারত। স্কুলে তো সেও ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু সংসারের টানাপড়েন সেই স্বপ্নময় পথ ছেড়ে তাকে বাস্তবতার বন্ধুর পথে নামতে বাধ্য করে। সামিউল আলম রাজন তাই কাকডাকা ভোরে শয্যা ছাড়ে। বাড়ির আঙিনায় মায়ের হাতে লাগানো সবজি তোলে। তারপর বই-খাতার বদলে ঝাঁপি ভর্তি সবজি নিয়ে ছোটে স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য। এটাই যেন তার নিয়তি। কিন্তু কেউ কি ভেবেছিল স্কুলছাড়া ছেলেটিকে পৃথিবীও ছাড়তে হবে অসময়ে? মানুষরূপী কিছু অমানুষের হিংস্রতার বলি হতে হবে? রাজনের বেলায় তা-ই হলো। চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো তাকে। পৈশাচিকতার সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে বিকৃত উল্লাসে মেতে উঠল রাজনের হত্যাকারীরা। ঘটনাটি ঘটল অনেক মানুষের সামনে। পুলিশও ছিল কাছেপিঠে। কিন্তু ছোট্ট রাজনের করুণ আর্তি স্পর্শ করতে পারেনি তাদের কঠিন হৃদয়। কেউ এগিয়েও আসেনি। তবে বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ সোচ্চার হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিচারের দাবিতে তারা রাস্তায় নামল।

রাজন হত্যার ঘটনা প্রথম দিন ততটা প্রচার পায়নি। স্থানীয় লোকজন লাশসহ আটক মুহিতকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে যায়নি; বরং বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তত্পর হয়। রাজনকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফনের সব আয়োজনও করে ফেলে পুলিশ। সেই হিসেবে একটি মামলাও করে। রাজনের বাবা সন্তানের লাশ শনাক্ত করে মামলা করতে গেলে পুলিশ তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে।

রাজন খুন হওয়ার পরদিন থেকে যখন ঘটনা প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্নের উদয় হয়। প্রথমত, রাজন কি আসলেই চোর ছিল? চোর হলেও তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে কেন? লাশসহ এক নির্যাতনকারীকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেওয়ার পরও পুলিশ কেন অন্য আসামিদের ধরতে তত্পর হচ্ছে না? হত্যাকাণ্ডের পর সেদিন রাতে থানা কম্পাউন্ডে খুনিরা কোন সাহসে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াল? পুলিশ কি আসামি ধরতে পারছে না, নাকি চেষ্টাই করছে না? পুলিশের এমন নির্লিপ্ততা একটি দিকেরই ইঙ্গিত দেয় আর তা হলো আর্থিক লেনদেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বড় প্রশ্ন দেখা দেয় তখন, মূল হোতা প্রবাসী কামরুল কোথায়?

সেসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে নেমে পড়ি কাজে। প্রথমেই রাজনের বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা। সেই উদ্দেশ্যে বাদেআলী গ্রামে তাঁদের ছোট্ট ঘরের আঙিনায় হাজির হই। কিন্তু জানা গেল, রাজনের বাবা বাসায় নেই। তিনি কোথায় কেউ বলতে পারল না। বাড়ির কেউ বললেন, শহর থেকে কেউ একজন এসে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে; আবার কেউ বললেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি এসে নিয়ে গেছে। কেউ বলেন কোর্টে, কেউ বলেন পুলিশের সঙ্গে।

শেষ পর্যন্ত রাজনের বাবার সঙ্গে যখন যোগাযোগ হলো, ততক্ষণে দুপুর গড়িয়েছে। সারা দিনে নানা মানুষের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে তিনি ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। যেন বাক্শক্তিও হারিয়েছেন। যা হোক, তাঁর সঙ্গে কথা বলে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। রাজনের বাবা বললেন, স্থানীয় জনতা রাজনের লাশসহ মুহিত আলম নামের একজনকে হাতেনাতে আটক করে থানায় খবর দিয়েছিল। পাশের জালালাবাদ থানার দারোগা মো. আমিনুল ইসলাম দল নিয়ে সেখানে হাজির হওয়ার পর তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হয় মুহিতকে। অন্য যে তিনজন ছিল, তারা পালিয়ে যায়। লাশ ফেলার কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটিও পুলিশকে বুঝিয়ে দেয় গ্রামবাসী। দারোগা আমিনুল লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে হাসপাতাল মর্গে পাঠান। রাতে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মামলাও রুজু করেন।

রাত ১১টার দিকে রাজনের বাবা আজিজুর রহমান যখন থানায় পৌঁছেন, ততক্ষণে দারোগা আমিনুল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সব আয়োজন গুছিয়ে এনেছেন। অজ্ঞাতপরিচয় দেখিয়ে লাশ দাফনের প্রক্রিয়াও শুরু করে দিয়েছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে পুলিশকে অনুরোধ করেন আজিজুর। কিন্তু ওসি আলমগীর হোসেন ও দারোগা আমিনুল ইসলাম তাঁর কথায় কান দেন না; বরং দুই আসামি আলী ও রুহুলের সঙ্গে কানাঘুষা করতে থাকেন। আজিজুর আবারও পীড়াপীড়ি করলে তাঁরা কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন, লাশ বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন হবে। আজিজুর রহমান প্রতিবাদী হয়ে উঠলে, মামলা নেওয়ার দাবি জানালে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন তাঁরা।

রাজনের বাবার বর্ণনা থেকেই আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি স্পষ্ট বুঝে নেওয়া যায়। এরপর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—কামরুল কি দেশে আছে, নাকি টাকার প্রভাব খাটিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে? এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেল, ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে কামরুলকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেন ও এসআই মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁদের সঙ্গে একাধিক জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততারও তথ্য পেলাম।

কামরুল যাতে দেশ ছাড়তে না পারে সে জন্য পুলিশ ১১ জুলাই সন্ধ্যার দিকে রেড অ্যালার্ট জারি করে। তারা দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করে, কামরুল দেশেই আছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাদের দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয় ১৩ জুলাই সন্ধ্যায়। খবর পাওয়া যায়, জেদ্দায় প্রবাসীরা কামরুলকে ধরে গণপিটুনি দিয়ে সৌদি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এ ঘটনার পর প্রথমেই প্রশ্ন আসে, পুলিশের রেড অ্যালার্টের পরও কামরুল কিভাবে দেশ ত্যাগ করতে পারল? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নানা সূত্রে চেষ্টা চালানোর পর ১৪ তারিখে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের একটি সূত্র থেকে নিশ্চিত হই, রাজন হত্যার দুই দিন পর ১০ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে (বিজি-৪০৪) করে কামরুল জেদ্দায় যায়। তার পাসপোর্টের নম্বর আর-০১২৪৬২২। মূলত পুরো বিষয়টাই ছিল দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের সাজানো নাটক। কামরুলকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পর আইওয়াশের জন্য রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। আমি এ-সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট ঢাকায় পাঠাই। ঢাকা অফিস থেকে আরো দুই সহকর্মী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে নিউজটি আরো সমৃদ্ধ করেন। ১৫ জুলাই কালের কণ্ঠ’র প্রথম পাতায় ‘পুলিশকে হাত করেই দেশ ছাড়ে কামরুল’ শিরোনামে সংবাদটি ছাপা হয়।

পুলিশ প্রশাসনসহ সর্বত্র সংবাদটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট কালের কণ্ঠেই প্রথম ছাপা হয়। অনলাইনে অনেকে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন। ইতিমধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এম রোকন উদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

ন্যক্কারজনক এই ঘটনা এবং পুলিশের ভূমিকায় সারা দেশের বিবেকবান মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাদের চাপে একে একে গ্রেপ্তার হতে থাকে অন্য আসামিরা। কেউ ধরা পড়ে পুলিশের হাতে, তবে বেশির ভাগ আসামি স্থানীয় লোকজনই ধরিয়ে দেয়। এর মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা ঘটে রাজন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের অন্যতম চৌকিদার ময়নার বেলায়। তার মা নিজে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন ছেলেকে। দেশ ছেড়ে পালানো কামরুলকেও সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি ২৩ জুলাই রাতে প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্তে পুলিশের গাফিলতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরদিনই জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয় এবং সেই দারোগা আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ তিনজনই এখন বিভাগীয় শাস্তির প্রহর গুনছেন।

এদিকে মাত্র চার মাসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়। গত ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে ঘটনার অন্যতম হোতা সৌদিপ্রবাসী কামরুল ইসলাম, সেই চৌকিদার ময়না মিয়াসহ চারজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। একজনের যাবজ্জীবন, ঘাতক কামরুলের তিন ভাইয়ের সাত বছর করে এবং অন্য দুজনের এক বছর করে কারাদণ্ড হয়।