মৎস্য সম্পদের অপার সম্ভাবনা আশুড়ার বিল

আশুড়ার বিল নিয়ে রয়েছে পৌরাণিক বিচিত্র কাহিনী। অতি প্রাচীনকালে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে লড়াই চলছিল আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। সেখানে দেবতাদের কাছে অসুররা পরাজিত হয়েছিল। দেবতাদের খঞ্জরের আঘাতে অসুরদের ঝরা রক্ত তাদেরই পায়ে দেবে যাওয়া গর্তে ভরে গিয়েছিল বলে অসুরের বা আশুড়ার বিল নামকরণ করা হয়। অনেকে বলেন, বিলের চারপাশ থেকে ৮০টি নালা চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেছে বলে বিলটির আশি নালা হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। বিশাল ওই বিলের গভীরতা ও কাদার তলানি এবং চারপাশ বেষ্টিত শালবন এক সময় নানা কিংবদন্তির জন্ম দেয়। বিলের মাঝে কতিপয় স্থানের নাম আছে, যেগুলোকে কেন্দ্র করে আরও কিছু চমৎকার কাহিনীও রয়েছে। যেমন— পাতিলদহ, বুড়িদহ, কাজলাদহ, পীরদহ, মুনির আইল ও মুনির থান ইত্যাদি।

ঐতিহাসিক এ আশুড়ার বিলে মৎস্য সম্পদের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বিপন্ন প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৃহৎ এ বিল থেকে মৌসুমে কমপক্ষে ১২০ মে. টন মাছ পাওয়া যায় বলে মৎস্য কর্মকর্তারা জানান। মাছের ঘাটতি পূরণেও এ বিল ভূমিকা রাখতে পারে যদি এটাকে নিয়ে নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া যায়। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় কি. মি. দূরে জাতীয় উদ্যান শালবনের কোল ঘেঁষে এ বিলের অবস্থান। আশুড়ার বিলের নবাবগঞ্জ ও বিরামপুরের এলাকা নিয়ে আয়তন ৩১৯ হেক্টর। গত আগস্টের দিকে বিরামপুর মৎস্য বিভাগ বিরামপুর অংশে এক লাখ টাকার মাছের পোনা অবমুক্ত করেছে। এখনো এ বিলটিতে অনেক হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির মাছ জেলেদের হাতে ধরা পড়ে। এক সময় বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বিলের বোয়াল ও পাবদা মাছ খুব সুস্বাদু। টেংরা, কই, মাগুর, পুঁটি, চিংড়ি, আইড়, শোল, গজার, বাইমসহ নানা প্রজাতির মাছ এখনো পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানান।

নবাবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, উত্তরবঙ্গের বৃহৎ এ বিলটি লম্বায় পাঁচ কিলোমিটার। এ বিলের কিছু অংশ বিরামপুর উপজেলার মধ্যে রয়েছে। নবাবগঞ্জ উপজেলা এলাকায় বিলের আয়তন ২৫১ হেক্টর জমি। এ বিলের সুফলভোগী হিসেবে রয়েছেন সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা (সিবিএফএম) সমিতির সদস্যরা। সুফলভোগীদের সমিতি রয়েছে ২৯টি। এর মধ্যে মহিলা দুটি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির সুফলভোগীর সংখ্যা ৬০৪৫ জন। বিলের বুড়িদহে ২০০৬ সালে ০.৫ হেক্টর জমিতে মাছের একটি অভয়াশ্রম ও কাজলাদহে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ০.৫ হেক্টর জমিতে আরেকটি অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। অভয়াশ্রমগুলো বিপন্ন প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিলে গত অর্থবছরে সরকারিভাবে ২ লাখ টাকার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। ওই সুফলভোগীদের শুধু আমরা সচেতনতা বিষয়ে পরামর্শ দিই। তিনি জানান, বিলের সুফলভোগীদের সঞ্চয়ের টাকায় মাছ ছাড়লে তাদের আগ্রহ বাড়বে। বিলটি খননসহ বিলের পূর্ব প্রান্তে পানি ধারণের জন্য একটি স্লুইস গেট বা রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমবে না। পরিকল্পিতভাবে বিলটি সংস্কার করে মাছ চাষ করলে জেলায় মাছের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।