রপ্তানি বাণিজ্যে বড় সাফল্য বছর শেষে

বছর শেষে চমক দেখাল দেশের রপ্তানি বাণিজ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। আর রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান দুই খাত ওভেন ও নিটওয়্যার খাতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সব মিলে দীর্ঘদিন পর রপ্তানির সব সূচকই ইতিবাচক ধারায় ফিরল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর রপ্তানি বাণিজ্য ইতিবাচক ধারায় ফেরার প্রধান কারণ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর এটাকে টেকসই করতে হলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে রপ্তানি সহায়তা দিতে হবে। এ জন্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয়ের দাবি জানান তাঁরা।

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসই রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে যায়নি। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেও (জুলাই-অক্টোবর) রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশের নিচে। অথচ চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে অর্থাত্ ডিসেম্বরে এসে প্রবৃদ্ধি হলো ৭.৮৪ শতাংশ। এর আগের পাঁচ মাসের মধ্যে নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭১ শতাংশ, অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি ৪.৯৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ০.৮৩ শতাংশ, আগস্টে ছিল ৪.৭১ শতাংশ এবং জুলাই মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল -১১.৯৬ শতাংশ। অর্থাত্ বছরের প্রথম মাসে যেখানে রপ্তানি আয়ে ১১.৯৬ (-) শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, সেখানে ষষ্ঠ মাসে এসে সেটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.৮৪ শতাংশ।

বছর শেষে রপ্তানি আয়ের এমন চমক সম্পর্কে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন,  রানা প্লাজা ধসের পর দেশে ভাবমূর্তি সংকট দেখা দিলে সাময়িক সময়ের জন্য রপ্তানি আয়ে কিছুটা ভাটা ছিল। তবে পোশাক খাতের ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এবং সরকারের উদ্যোগের ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। আর এতে সহযোগিতা করেছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন পর রপ্তানি বাণিজ্য ইতিবাচক ধারায় ফেরার প্রধান কারণ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

ইপিবি সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করে এক হাজার ৬০৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার আয় করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭.৮৪ শতাংশ বেশি। আর এ বছর ডিসেম্বরে গত বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ১২.৬৬ শতাংশ। ইপিবি গতকাল মঙ্গলবার হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এক হাজার ৫৮৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশ এক হাজার ৬০৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১.৩৮ শতাংশ বেশি আয় দেশে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল এক হাজার ৪৯১ কোটি ৪২ লাখ ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরের এই সময়ের চেয়ে রপ্তানি আয় বেশি হয়েছে ৭.৮৪ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে ওভেন পোশাক থেকে ৬৭০ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। আর নিট পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ৬৪৩ কোটি ২০ লাখ ডলার।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৪২ শতাংশ। আর নিট পোশাকে প্রবৃদ্ধি ৬.১১ শতাংশ। নিট পোশাক রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি হয়েছে ২.৩৮ শতাংশ। তবে ওভেনের আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ০.৩৮ শতাংশ বেশি।

এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা খুবই সুখের খবর যে অনেক দিন পর রপ্তানি বাণিজ্যের সব সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আমরা মনে করি এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর জন্য অবশ্য ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান, অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সে গার্মেন্ট খাতের মান উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিও অনেক ভূমিকা রেখেছে। রপ্তানি  বাণিজ্যের এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই আমাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ রকম স্বাভাবিক থাকে তাহলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি আরো ভালো কিছু করা সম্ভব।’ আর এই রপ্তানি আয় টেকসই করতে হলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তেলের দাম সমন্বয় করার দাবি জানান তিনি। কারণ প্রতিযোগী দেশগুলো রপ্তানিতে সেসব সুবিধা পায় সেসব সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে রপ্তানি খাতকে এগিয়ে নিতে সহায়তা প্রয়োজন।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-ডিসেম্বরে হিমায়িত খাদ্য পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.২২ শতাংশ। হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ৩.২ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩.২৪ শতাংশ।