সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার দিন

ড. মিল্টন বিশ্বাস
৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক তারিখ। ২০১৪ সালের ওই দিন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশ সন্ত্রাসের কালো হাত থেকে মুক্ত হয়; সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা পায়। আর পুনরায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়। মানুষের জীবনে স্বস্তি ও শান্তির মোক্ষম মুহূর্ত সৃষ্টিতে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা বিশ্ববাসীর কাছে আজ স্পষ্ট। এজন্য তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা মহিমান্বিত। ২৮ ডিসেম্বর (২০১৩) নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তরুণদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তাঁর নেতারা নিজেদের বর্তমানকে উত্সর্গ করেছেন। কারণ এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। বিশ্বের ৭৬তম ধনী রাষ্ট্র এটি; বিশ্বের ১১তম সুখী দেশও। বিশ্বের ৬ষ্ঠতম ভাষা হিসেবে বাংলা অনেক আগে থেকে স্বীকৃত। আমরাই একমাত্র ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। অন্যদিকে বাংলাদেশ শক্তিশালী ১০টি মুসলিম দেশের একটি। এখানে (কক্সবাজারে) রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় লোনাপানির বনাঞ্চল সুন্দরবন এখানে অবস্থিত। বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সেতু। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে বেশি সৈন্য প্রেরণ করেছে আমাদের আওয়ামী লীগ সরকার। এ দেশটি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে ২৭তম, গার্মেন্টস শিল্পে প্রথম। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ দেশটি ২০৫০ সালে বিশ্বের অন্যতম ১০টি ক্ষমতাধর দেশের একটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করে এদেশ নতুন বছরে (২০১৬) পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে যাচ্ছে। আসলেই লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার ইতিহাসই আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। আমরা এদেশ নিয়ে গর্ব করতেই পারি। আর এ গৌরব অর্জনে যে দলটির সবচেয়ে বেশি অবদান সেটি হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। সকলে এক কথায় স্বীকার করবেন যে আওয়ামী লীগ একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক সংগঠন। এই দলের অভ্যুদয়ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দলের নেতৃত্বাধীন সরকার ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচন অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রমাণ করেছে যে দলটি জনগণের মঙ্গল চিন্তা করে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান অনুসরণ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে দলীয় আদর্শের চেয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা গুরুত্ববহ। এজন্য আওয়ামী লীগ তার উদ্দেশ্য ও আদর্শের বাস্তবায়নে যেমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এগিয়ে চলেছে তেমনি জনগণের সংকট মুক্তির লক্ষে কাজ করছে। কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণ নয় আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন বিপুল। কারণ এ দলটি জনগণের সংগঠন। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের অন্যতম এ দল। আওয়ামী লীগ দেশপ্রেমিক সংগ্রামী, প্রতিবাদী, নির্ভীক ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান। উদার জাতীয়তাবাদের আদর্শের কারণে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক, সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য প্রণীত অর্থনীতিতে বিশ্বাসী সংগঠন।

 

রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপক। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা দেখতে পেয়েছিলাম অসাধারণ উপস্থাপনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তাদের সাফল্যগুলো নিরন্তর কয়েকটি টিভি চ্যানেলে প্রচার করে চলেছে। সেখানে তথ্যাদির নিরিখে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রচার করা হয়েছিল। আর তা যে সম্পন্ন হয়েছে এটা জনগণের কাছে স্পষ্ট। না হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া কিংবা কোনো ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশিত হলে তার সমালোচনা করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। তত্কালীন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যদিও কেউ কেউ মিথ্যাচার করেছিলেন। তবে উপস্থাপিত তথ্যাদি বা সরকারের উন্নয়ন না হওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি কেউ। সরকারের উন্নয়নের ব্যাপারে কোনো চ্যালেঞ্জ না করে নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার জন্য উদ্ভট আর মিথ্যাচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল বিএনপি-জামায়াত। তারা আসলে সরকারের উন্নয়নকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। উল্লেখ্য, সেই সময় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের প্রচার-প্রচারণায় বর্ণিত উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি। মহাজোট সরকারের আমলে সমুদ্র সীমানাসংক্রান্ত মামলায় মিয়ানমারের কাছে জয়ী হওয়া, বিশাল সমুদ্র অঞ্চল বাংলাদেশ প্রাপ্তি, জোট সরকারের চেয়ে মহাজোট সরকারের আমলে অতিরিক্ত বিদ্যুত্ উত্পন্ন হওয়া, খিলগাঁও ফ্লাইওভার ও কুড়িল উড়াল সড়ক তৈরি হওয়া, সেনাবাহিনীর জন্য মেকানাইজ্ড ব্রিগেড ও ব্যাটালিয়ন গঠন করা, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া সবই হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সদিচ্ছায়। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১৪-) ক্ষমতায় এসে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা, স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু হওয়া প্রভৃতি বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে। মূলত মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যাদি, সরকারের সাফল্য, সরকারের উন্নয়ন দিবালোকের মতো সত্য ছিল। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ১৫৪টি আসনে আগেই জয়ী হয়েছে; বাকি আসনে নির্বাচন ভণ্ডুল করেও তাদের পরাজিত করার কোনো সুযোগ কেউ পায়নি। এজন্য বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের ওই নির্বাচন সম্পর্কে যুক্তিহীন বিরোধিতা মূল্যহীন। তারা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার রাজনীতিতে অবরোধ-হরতাল দিয়ে কোনো মীমাংসায় উপনীত হতে পারেনি। বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও লাভ হয়নি। বিগত বছরগুলোতে বিএনপি ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বলে আসছিল সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার করা হবে, বিরোধী জোট আরো শক্তিশালী হবে, কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো হবে। কিন্তু গত ডিসেম্বর (২০১৫) পর্যন্ত তাদের সরকার পতনের কিছু দেখা গেল না। তবে হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে বিএনপি-জামায়াত।

 

৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচন সফল হয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশকে বিশ্বসভার মধ্যমণিতে আসীন করার জন্য। উপরন্তু সফল বাংলাদেশ দেখার জন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

 

n লেখক : অধ্যাপক  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,