অজপাড়াগাঁয়ে জীবন বদলানোর গল্প

কালুহাটী গ্রামটি অজপাড়াগাঁ থেকে একটু আগে। বাংলাদেশের অন্য অজপাড়াগাঁয়ের চেয়ে এর পার্থক্য হলো এ গ্রামের ভেতর দিয়ে একটি পাকা সড়ক মহাসড়কের সঙ্গে গিয়ে মিলেছে। তবুও নিকটতম জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। বরঞ্চ ভারতের সীমান্তই গ্রামটির বেশি কাছে। অন্য গ্রাম থেকে আরেকটি পার্থক্য গ্রামটিকে করেছে সমৃদ্ধ। এই গ্রামে আছে ৩৫টিরও বেশি জুতার কারখানা। যা গ্রামের উদ্যোক্তাদের জীবন বদলে দিয়েছে, শ্রমিকদের দিয়েছে অভাবহীন জীবনের সন্ধান। পুঁথিগত ভাষায় যাঁদের বলা হয় ‘চেঞ্জ মেকার’, নূ্যনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও আমিরুল হক তাঁদেরই একজন। ঢাকার সিদ্দিকবাজারে জুতার কারখানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে তিনি ফিরে যান নিজ গ্রাম রাজশাহীর চারঘাট থানার কালুহাটীতে। সেটা ১৯৮৩ না ১৯৮৪ সাল তা ঠিক মনে নেই তাঁর। গ্রামের ফিরে সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে তিনি শুরু করেন জুতা তৈরির কাজ। তাঁর দেখানো পথ ধরে ওই গ্রামে এখন অনেকেই জুতার কারখানার মালিক। অনেকেই আমিরুল হকের চেয়ে বড় কারখানা করেছেন। উত্তরবঙ্গজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে বাজার। সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে, নিজেদের চেষ্টায় ও নিজেদের জ্ঞানে কালুহাটীর বাসিন্দারা শিল্পের সূচনা করেছেন। নিজেরাই বাজার খুঁজে নিয়েছেন। সরকারের কাছে প্রণোদনা বা নীতি-সহায়তা চাননি। বরং তাঁদেরকেই খুঁজে নিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন। এক বছর আগে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ এবং আরো কম সুদের ঋণ-সহায়তা দিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ পেয়ে প্রকৃতপক্ষেই উপকৃত হয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা এখন আগের চেয়ে ভালো মানের পণ্য তৈরি করতে পারছেন। পাশাপাশি ঋণ নিয়ে ব্যবসার সম্প্রসারণও হয়েছে। বড় বড় শিল্পপতিদের মতো কেউ ঋণখেলাপি হননি। কালুহাটী পাদুকা প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি নওশাদ আলী সরকার জানান, ওই গ্রামে বর্তমানে ৩৫টির মতো কারখানা আছে। এর মধ্যে তাঁদের সমিতির সদস্য ২১ জন। ওই সব কারখানায় প্রায় সাড়ে ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন। যাঁরা ওই গ্রামেরই সন্তান। তাঁরা জুতা তৈরি করেন চামড়া ও রেঙ্নি দিয়ে। প্রতি জোড়া জুতার দাম সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা। ওই গ্রামের কারখানাগুলো থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা জুতা কিনে নিয়ে যান। আর জুতা তৈরির উপকরণ তাঁরা কিনে আনেন ঢাকা থেকে। ওই সব উপকরণ মূলত চীনের তৈরি। তিনি আরো জানান, গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এসএমই ফাউন্ডেশন তাঁদের প্রশিক্ষণ ও ৯ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের বানেশ্বর শাখার মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ১৯ জন উদ্যোক্তার মাঝে ৪৬ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ ঋণ পাওয়ার পর গত এক বছরের কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ও উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। আর বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ঋণের উচ্চ সুদের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছেন তাঁরা। আগে ওই সব এনজিও থেকে ৪৭ শতাংশ সুদ হারে ঋণ নিতে হতো। আর ঋণের চক্রজালে পড়ে কয়েকটি কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। ন্যাশনাল শু কম্পানির মালিক মোকসেদ আলী জানান, তিনি ১৪ বছর আগে ৫০ হাজার টাকা পুঁজি ও দুজন কর্মচারী এ ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর পুঁজির পরিমাণ ২০ লাখ টাকার কাছাকাছি। তাঁর কারখানায় ১৮ থেকে ২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেখানে দিনে ১৫০ থেকে ২০০ জোড়া জুতা তৈরি হয়। মোকসেদ আলীর বাড়িতে পূর্বপুরুষের মাটির ঘর। কিন্তু তিনি নিজে যেটি তৈরি করেছেন সেটি ইট সিমেন্টের একটি পাকা পায়খানা। কারখানা তৈরি করে মালিকরা যেমন পুঁজি গড়ে তুলেছেন, তেমন শ্রমিকরাও ভালোই আছেন। তাঁদের আয় মাসে গড়ে ৯ হাজার টাকার কাছাকাছি। গ্রামে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। গ্রামের লোকেরা গর্ব করেই বলেন, অন্য গাঁয়ের চেয়ে কালুহাটীর ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ভালো ফল করছে। মো. কিরণ আগে স্থানীয় নদীতে নৌকায় খেয়া পারাপারের কাজ করতেন। সেতু হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জুতার কাজ শিখে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে নিউ মান্নান শুজ নামের কারখানার একজন দক্ষ কর্মী। তিনি জানান, কারখানাগুলোতে কাজের মজুরি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে। মৌসুমের সময় যখন কাজ বেশি থাকে তখন ১৫ হাজার টাকাও আয় করা সম্ভব। আর যখন কাজ কম থাকে তখন কম হলেও ৯ হাজার টাকা আয় করা যায়। ফলে গড়ে ৮-৯ হাজার টাকা আয় হয় তাঁদের। আর একই গ্রামে নিজের বাড়ি হওয়ায় ঢাকার পোশাককর্মীদের মতো বসবাসের বেশি খরচ নেই। নিউ লিবার্টি শুজের মালিক মো. রাজু বলেন, ‘আমার কারখানায় ১২ জন শ্রমিক কাজ করে। ১২টা পরিবার এর ওপর নির্ভর করে। আমিও নিজেও অনেক ভালো আছি। এটাই আমাদের শান্তি।’ তিনি হাসি মুখে জানান, তাঁর মেয়ে ঋতু এ বছর দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠেছে প্রথম স্থান অধিকার করে। তবে কারখানার মালিকদের সামনে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। বড় সমস্যা হলো মাসে মাসে ঋণের কিস্তি দেওয়া। তাঁরা চান বছরে একবার বা দুইবার ঋণের কিস্তি দিতে। কারণ প্রতি মাসে পণ্য বিক্রি করে তাঁরা টাকা আদায় করতে পারেন না। তাঁদের পণ্য বেশি বিক্রি হয় বছরের দুই ঈদে। অন্য সমস্যাটি হলো বাজার সম্প্রসারণ। শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, যমুনার অপর পারেও জুতা বিক্রি করতে চান তাঁরা। তাঁরা যাতে এ কাজটি করতে পারেন সেজন্য এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তা চেয়েছেন। চীনের পণ্য যেখানে ঢাকার বাজার দখল করে আছে, সেখানে কালুহাটীর জুতাও সমানে পাল্লা দিতে সক্ষম। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রেজওয়ানুল কবির বলেন, কালুহাটীর পাদুকা পল্লীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে আগামী পাঁচ বছরে আরো অন্তত তিন হাজার লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে। – See more at: