কৃষিতে ভরসার ইঙ্গিত দিচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। এ অঞ্চলে গত চার বছরে ধানের উৎপাদন ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ ও আলু উৎপাদন। এর মাধ্যমে আবার কৃষির ভরসা হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল।
কৃষি ও খাদ্যনীতি-বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চিত্র পাওয়া গেছে।
লবণাক্ততার কারণে আগে দক্ষিণের জেলাগুলোয় বছরে একবার বোরো ধান চাষ হতো। বাকি সময় জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলে ঘের করে শুরু হয় চিংড়ি চাষ। কিন্তু চিংড়ি চাষে লোকসান, ধান উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, ডাল, তেলজাতীয় শস্য ও আলুর মতো পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এটা কেবল দক্ষিণাঞ্চল নয়, পুরো দেশের খাদ্যব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।
ইফপ্রির ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গত চার বছরে ধানের দাম না বেড়ে উল্টো ৬ শতাংশের মতো কমেছে। এতে হতাশ কৃষক ৩ দশমিক ৬ শতাংশ জমিতে ধানের চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এতে ধানের উৎপাদন কমেনি, বরং ২ শতাংশ বেড়েছে। আর আমন ধানের চাষ বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ।

একই সঙ্গে গত চার বছরে দক্ষিণাঞ্চলের ২০টি জেলায় ভুট্টার উৎপাদন এলাকা ৩৮০ শতাংশ, ডাল ৩০ শতাংশ, তেলজাতীয় শস্য ৩৫ শতাংশ ও আলুর উৎপাদন এলাকা ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি মাছের ঘেরের পাশে সবজি চাষ করার প্রবণতাও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে ব্যাপক হারে বাড়ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ভোলা, বরগুনা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মেহেরপুর, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাগুরা ও ফরিদপুরে কৃষির পরিবর্তন নিয়ে জরিপ চালায় ইফপ্রি।
গত দুই মাসে একাধিকবার দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি জেলায় গিয়ে কৃষির ওই বদল চোখেও পড়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, নড়াইল ও মাগুরা জেলায় চিংড়ি ও মাছ চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ বাড়তে দেখা গেছে। বিশেষ করে সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী, মুগ ও মসুর ডাল এবং মাছের ঘের ও পুকুরপাড়ে সবজির আবাদ সহজেই নজর কাড়ছে।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের কৃষক শেখ মোখলেস আলীকে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার ওই বদলের প্রতীক বলা যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক যুগ আগেও তিনি তাঁর ছয় বিঘা জমির পুরোটাতে চিংড়ি চাষ করতেন। এখন দুই বিঘায় ঘের আছে, বাকি জমিতে সূর্যমুখী, সরিষা ও মসুর ডাল এবং ধান চাষ করেন। তবে বছর পাঁচেক আগে তিনি চিংড়ি বাদ দিয়ে ধান চাষ শুরু করলেও প্রথম বছর ফলনে মার খান। পরের বছর ফসল হলেও ভালো দাম পাননি তিনি। ২০১২ সাল থেকে ব্র্যাকের সহায়তায় সূর্যমুখীর চাষ শুরু করেন। পরের বছর সরিষা ও মসুর ডালের চাষ করেন তিনি। এখন এসব ফসল চাষ করে তাঁর চিংড়ির চেয়ে বেশি আয় হচ্ছে বলে জানান শেখ মোখলেস।
ওই ছয়টি জেলার বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। তাঁরা জানান, চিংড়ি চাষ বাদ দিয়ে ফসল চাষের দিকে তাঁরা ঝুঁকছেন ভালো দাম পাওয়ার কারণে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকসহ দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে তাঁদের সহযোগিতা করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার উন্নতির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছিল। তাতে বলা হয়, লবণাক্ততা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ৫০ শতাংশ জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল হয়। আর মাত্র ৪৬ শতাংশ জমিতে হয় দুটি ফসল। দেশের কৃষিজমিতে বছরে গড় শস্যাবর্তনের হার ১৭৬ শতাংশ। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের শস্যাবর্তনের হার ১৫৯ শতাংশ। আর ওই এলাকার ১৫ শতাংশ জমিতে কোনো ফসলই হয় না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় তৈরি করা ওই মহাপরিকল্পনা দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফসলের জাত হিসেবে ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের চাষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাল ও তেলজাতীয় শস্যে এখনো বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে মোট পাঁচটি প্রকল্প পরিচালনা করছি। ব্রির উদ্ভাবিত জাতগুলো আরও জনপ্রিয় করতে আমরা সামনে কিছু উদ্যোগ নেব। আমাদের মূল লক্ষ্য ওই এলাকায় পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো।’
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন সংস্থার (এসআরডিআই) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট উচ্চ লবণাক্ত এলাকা। বাকি জেলাগুলোতে মাঝারি ও স্বল্প লবণাক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে সেচের পানির অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর বেশির ভাগ জমিতে বর্ষার তিন মাস ছাড়া বাকি সময় চাষ করা যেত না।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গত চার বছরে মোট ২০টি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। যার অর্ধেকই দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী লবণাক্ততা, খরা ও ঠান্ডা সহিষ্ণু জাত। কৃষক পর্যায়ে ওই জাতগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে।
ব্রির মহাপরিচালক জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী আরও কিছু জাত নিয়ে আমরা কাজ করছি। নতুন জাতগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা বেসরকারি সংস্থাগুলোরও সহযোগিতা পাচ্ছি।’
ইফপ্রির ওই গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষক কিছুটা হতাশ ছিলেন। তবে তাঁরা বসে থাকেননি। ধান চাষের ক্ষেত্রে জাত নির্বাচনে কৃষক যৌক্তিক ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক সবচেয়ে বেশি চাষ করতেন বাণিজ্যিক সেচনির্ভর বোরো ধান। কিন্তু এই চার বছরে ধানের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। ইউরিয়া সারের দাম বেড়েছে ১১ শতাংশ। কৃষি-মজুরি বেড়েছে ২৪ শতাংশ। সেচের খরচ বেড়েছে ৯ শতাংশ। ফলে বোরো ধান বিক্রি করে কৃষকের মুনাফা কমে গেছে। চার বছর আগে যেখানে মোট চাষের জমির ৩১ শতাংশে বোরো ধানের চাষ হতো, ২০১৫-তে তা ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে কৃষক বৃষ্টিনির্ভর আমন ধান চাষের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। বিশেষ করে দেশি জাতের আমন ধান চাষ ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। চার বছর আগে মোট চাষের জমির ২ দশমিক ২ শতাংশ ছিল আমন। ২০১৫-তে এসে তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বোরোর তুলনায় আমনে খরচ ৩৮ শতাংশ কম। উৎপাদনও অবশ্য কম হয়।
ইফপ্রি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আখতার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে একসময় খাদ্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল দক্ষিণাঞ্চল। লবণাক্ততা ও চিংড়ি চাষের কারণে আশির দশকের পর এখানে ফসল উৎপাদন কমে যায়। ফলে দেশের কৃষি উত্তরাঞ্চলনির্ভর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নতুন করে বরিশাল, খুলনা ও ঢাকা বিভাগের বৃহত্তর ফরিদপুরের জেলাগুলোয় কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চল কৃষিতে ভরসার জায়গায় চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’