অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে গ্রাম

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসেছে পরিবর্তন। কৃষির আধুনিকায়ন, পুঁজির সঞ্চালন, অর্থ ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ, সেলফোন, ব্যাংকিং, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে নগরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বেড়েছে গ্রামের। গ্রামীণ জীবনাচারে এসেছে গতি। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৮০ শতাংশের বেশি অকৃষি খাতের হলেও এর ৭১ শতাংশই এখন গ্রাম বা পল্লীনির্ভর। অর্থাত্ গ্রামই হয়ে উঠছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩-এর তথ্যও বলছে সে কথা। অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের অকৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক ইউনিট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭৮ লাখ ১৮ হাজার। এর ৭১ দশমিক ৪৮ শতাংশই গ্রামভিত্তিক।

শুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৩ সালে দেশের পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ২৩ লাখ ২১ হাজার ৭২৮টি। দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের তা ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১৩ সালে এসে পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৯। গত এক দশকে এ বৃদ্ধির হার ১৪০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতির এ পরিবর্তনে বড় অবদান রয়েছে ক্ষুদ্রঋণের। ঋণের অর্থ এখন তারা ক্ষুদ্র এন্টারপ্রাইজে বিনিয়োগ করতে পারছে। গ্রামীণ চাহিদা মেটাতে স্থানীয় অনেক পণ্যও তৈরি হচ্ছে গ্রামে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। বিকশিত হচ্ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির সুযোগ।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে অর্থনৈতিক শুমারিতেও। এতে বলা হয়েছে, এক দশক আগে অকৃষিমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিলেন ১ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার ৪২২ জন। ২০১৩ সালে সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০। অর্থাত্ এক দশকে অকৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কর্মসংস্থান বেড়েছে ১১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণও বেড়েছে। এক দশক আগে মাত্র ১২ লাখ ২৯ হাজার ৪১৩ নারীর কর্মসংস্থান হলেও ২০১৩ সালে তা ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জনে উন্নীত হয়েছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ অর্থনৈতিক শুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা নির্ভর অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে। এটিই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিতে মানুষ নিজে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। অন্যকেও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। গ্রাম মানেই এখন কৃষিকাজ নয়। গ্রামে কৃষির বাইরে অকৃষি খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ছে। এর অর্থ হলো, গ্রামের মানুষ কৃষির বাইরে অকৃষিকাজেও পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পেশা বাছাইয়ে বহুমুখিতা তৈরি হয়েছে। এটিই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

গ্রামীণ অর্থনীতির এ পরিবর্তনে আরেকটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে রেমিট্যান্স। বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে সেলফোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির সম্প্রসারণেরও। সেলফোনের কারণে তথ্য বিনিময় অনেক সহজ হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন সব ধরনের তথ্য জানতে পারছেন, যা তাদের আয় বর্ধনমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে উত্সাহিত করছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে চাহিদামতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন তারা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির স্বস্তির জায়গা হলো সার্বিক সক্ষমতা অর্জন। ছোট ছোট অর্থনৈতিক ইউনিটের বিকাশের মধ্য দিয়েই এটি সম্ভব হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় গ্রামভিত্তিক শিল্প ইউনিটগুলোর ওপর নজর দেয়ার সময় এসেছে। বিশেষ করে বাজারের সঙ্গে গ্রামের শিল্প ইউনিটগুলোর সংযোগ বাড়াতে হবে।

উল্লেখ্য, কৃষিবহির্ভূত আর্থসামাজিক অবস্থা নিরূপণে প্রতি ১০ বছর অন্তর অর্থনৈতিক শুমারি প্রকাশ করে থাকে বিবিএস। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করল সংস্থাটি। এর আগে ১৯৮৬ সালে প্রথমবার কৃষিবহির্ভূত অর্থনৈতিক শুমারি করা হয়েছিল। এর পর দ্বিতীয় শুমারিতে প্রথম পর্ব ২০০১ সালে শহর এলাকায় ও দ্বিতীয় পর্ব ২০০৩ সালে পল্লী এলাকায় জরিপ চালানো হয়। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৩১ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে এ বছরের শেষদিকে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যে কোনো ধরনের কারসাজি হয়নি। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের চাপ ছিল না। নিরপেক্ষভাবে বিবিএস এ শুমারি পরিচালনা করেছে। শুমারির এ তথ্য দেশের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতাকেই নির্দেশ করছে।