২০১৬ সালের জন্য বিনিয়োগের সুখবর দিয়েছে এডিবি

বিদায়ী বছরজুড়ে ছিল বিনিয়োগের জন্য হাহাকার। বিশেষ করে বছরের প্রথম তিন মাস নতুন বিনিয়োগের কথা চিন্তাই করতে পারেননি উদ্যোক্তরা। কিন্তু নতুন বছরের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুখবর দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তারা মনে করছে, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ দুটিই বাড়বে। শুধু তাই নয়, অবকাঠামো সংকট বেশ কিছুটা নিরসন হবে। যার প্রভাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে। ম্যানিলাভিত্তিক এ দাতা সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সর্বশেষ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, এই রিপোর্টে তার পূর্বাভাস দিয়েছে। রিপোর্টটি বুধবার এডিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় বাড়বে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে গত অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে। এডিবি মনে করছে, এবার প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হতে পারে গত বছরের মতো সাড়ে ৬ শতাংশ।
এডিবির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হলেও, গতবারের তুলনায় বেশ বাড়বে। এর কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনীতিতে মন্দা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ১২টি দেশের মধ্যে টিপিপি চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে যাবে। এডিবি মনে করছে গত বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংযত মুদ্রানীতি ও খাদ্য উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনায় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও পণ্য মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে। তবে এডিবির পরামর্শ, তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশকে রফতানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। সমৃদ্ধির সুফল বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০১৫ সালে দেশে সম্পদ ছিল, ক্ষেত্র ছিল কিন্তু বিনিয়োগের অভাব ছিল। আর এই অভাব মূলত আস্থার অভাব। এর পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও ছিল মন্দাভাব। এতকিছুর মধ্যেও ২০১৫ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নিজের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। যাত্রা শুরু করেছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। একই সঙ্গে এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী ৫ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাহিদা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে সর্বশেষ অর্থবছরে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে জাতীয় সঞ্চয় বর্তমান জিডিপির ২৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে পঞ্চবার্ষিকীর শেষ বছরে জিডিপির ৩২ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বের মধ্যে দশম স্থানে অবস্থান করছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক রিপোর্টে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। শীর্ষ ৩০টি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র রয়েছে বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে। প্রবাসীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে। সর্বশেষ অর্থবছরের হিসাবে বাংলাদেশে ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার পাঠিয়েছে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা। আর সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ৭৬ লাখ বাংলাদেশি বাস করে। গোটা বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠায় প্রবাসী ভারতীয়রা। রেমিট্যান্স আদান-প্রদানে বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি পরিবারের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ ১৬তম অবস্থানে রয়েছে।
বিদায়ী বছরের বৈশ্বিক উত্তাপ তেমন স্পর্শ করেনি দেশের অর্থনীতিকে। বিশেষ করে চীনের শ্লথগতির অর্থনীতি, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। দেশের অর্থনীতিতে মলিন ছিল রাজস্ব আদায়ের ইস্যু। কিন্তু নতুন বছরের প্রথমেই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। বিনিয়োগের নতুন মাত্রা শুরু হওয়ার প্রেক্ষিতে রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।