পদ্মা সেতু ও জরুরি কিছু প্রস্তুতি – ড. আবদুল জব্বার খান

বহুমুখী পদ্মা সেতু শুধু স্বপ্নের সেতু নয়; এটি স্বপ্ন পূরণেরও সেতু। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে জাতীয় মর্যাদা ও অহঙ্কার নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে মোক্ষম একটি প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্পকে ইউ টার্ন প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। এই সেতুটি বহুমুখী এ কারণে যে, এর ওপরের অংশ দিয়ে বাস-ট্রাক ইত্যাদি যানবাহন যেমন প্রমত্ত পদ্মার ওপর দিয়ে পারাপার হতে পারবে, একই সঙ্গে এর নিচের অংশ দিয়ে চলাচল করবে দ্রুতগামী ট্রেন। সেইসঙ্গে এই সেতুকে অবলম্বন করে নেওয়া হবে গ্যাস, অপটিক্যাল ফাইবার, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ। চার লেনবিশিষ্ট মূল সেতুটি দৈর্ঘ্যে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ২২ মিটার। সেতুটিতে মোট ৪১টি স্প্যান (অংশ) থাকছে, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। এত বড় স্প্যানের সেতু বাংলাদেশের কোনো নদীর ওপর দিয়ে ইতিপূর্বে করা হয়নি। স্প্যান বড় হওয়ার কারণে রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে তৈরি না করে ওজন কমাতে এই সেতুটির মূল অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে স্টিল দিয়ে। তীব্র বায়ুপ্রবাহ ও ভূমিকম্পজনিত ধাক্কা মোকাবেলায় বেছে নেওয়া হয়েছে ওয়ারেন ট্রাস ফর্ম। পুরো সেতুটির ভার বহন করার জন্য থাকছে ৪২টি পিয়ার (পিলার), যার প্রতিটির নিচে থাকছে গড়ে প্রায় ৬টি পাইল। নদীর মাঝখানের অংশে এই পাইলগুলো হবে স্টিলের তৈরি এবং পাড়ের কাছে হবে রিইনফোর্সড কংক্রিটের তৈরি। পাইলগুলোর ব্যাস ৩ মিটার এবং দৈর্ঘ্য নদীর তলদেশ ভেদ করে স্থানভেদে ১০১ মিটার থেকে ১১৭ মিটার পর্যন্ত। মূল সেতুটির নির্মাণ কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।

সেতুর দুই প্রান্তের একটি ঢাকার কাছের মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায়, অপরটি থাকছে শরীয়তপুর-মাদারীপুরের জাজিরায়। সেতুর এ দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচ রোড বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করছে আবদুুল মোনেম লিমিটেড। মাওয়া প্রান্তের সংযোগ সড়কটির দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং জাজিরা প্রান্তের দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার। নদী শাসন ও নদীর পাড় সংরক্ষণের কাজটি করছে চায়নার সিনো হাইড্রো কোম্পানি। দুই পাড় মিলে নদীভাঙন রোধের কাজ হবে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই সেতু প্রকল্পটির মূল দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
কারিগরি দিক থেকে এ প্রকল্পটি বেশ কিছু কারণে খুবই চ্যালেঞ্জিং। পুরো সেতুটির অবকাঠামো ও ভিত স্টিলের তৈরি হবে বলে এখানে বাতাসের লবণাক্ততার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেইসঙ্গে প্রমত্ত পদ্মার বিভিন্ন জায়গায় লুকানো খাড়ি থাকায় এবং সেতু হওয়ার পর স্রোতের ঘূর্ণিপাকে নদীর তলদেশের মাটি অনেক গভীর পর্যন্ত ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে অনেক গভীর পর্যন্ত পাইলিং করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ১৫০ মিটার স্প্যানের বিষয়টি। এই দীর্ঘ স্প্যান করার কারণে যদিও একেকটি পিয়ারের ওপর সেতুর ওজন বাড়ছে তবে অন্যদিক দিয়ে নদীগর্ভে পাইলিংয়ের কাজে সময় কমে যাচ্ছে। মোটের ওপর বলে যায়, পদ্মা সেতু আমাদের প্রকৌশলীদের জন্য একটি বিশাল লার্নিং পয়েন্ট। এ ধরনের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাই এখানে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকলেও টেকনোলজি ট্রান্সফারের জন্য দেশীয় প্রকৌশলীদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর ফলে ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের কাজটিও সহজ হবে ও পরনির্ভরতা কমবে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এই স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিয়মমাফিক সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো এগোচ্ছিল। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হলো দক্ষিণবঙ্গের মানুষ। বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তুলল দুর্নীতির। আপাতদৃষ্টিতে একজন বা দু’জনকে দোষারোপ করা হলেও এটি ছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে বিশ্বের বুকে একটি চরম দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার গভীর ষড়যন্ত্র। ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করলেন বাংলাদেশের উন্নয়নের কবি দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সাফ জানিয়ে দিলেন_ বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নয়; নিজেদের অর্থায়নেই হবে আমাদের পদ্মা সেতু! তার এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে দেশের অভ্যন্তরের অনেক নিন্দুকের মুখ চুন হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকও প্রমাদ গুনতে শুরু করল। ২৮ হাজার কোটি টাকার (৩ বিলিয়ন ডলার) একটি বিনিয়োগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়া তাদের জন্য কোনোভাবেই সুসংবাদ হতে পারে না। যে কোনো অর্থলগি্ন প্রতিষ্ঠান যদি ঋণ দিতে না পারে তাহলে সেটি দাতব্য চিকিৎসালয়ে পরিণত হয়। এই মাপের আরেকটি প্রকল্প পৃথিবীর আর কোনো উন্নয়নশীল দেশে হওয়ার সম্ভাবনাও নেই শিগগির। তাই, বিশ্বব্যাংকের এই বিশাল অঙ্কের টাকা অলস পড়ে রইল। শেখ হাসিনার দাবার চাল ঠিক পথেই এগোলো। এর সঙ্গে যোগ হলো বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান রিজার্ভের অবস্থা, বর্তমানে যেটি ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, দেশের টাকশালে জমে আছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনের তিন গুণ অর্থ! এই প্রকল্পের নিজস্ব অর্থায়নের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো অবকাশ থাকছে না এর ফলে। অবশেষে, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে পদ্মা সেতুর মূল অংশের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দু’পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে আরও আগে থেকেই এবং শেষের পথে রয়েছে এ কাজ। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে পুরো প্রকল্পটি শেষ হবে ২০১৮ সালের শেষভাগে।
এই সেতু বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে দেবে সম্পূর্ণভাবে। এর ফলে দক্ষিণবঙ্গে সৃষ্টি হবে শিল্পায়ন, পর্যটন ও আধুনিক নগরায়ন। এই বঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন যেসব চিংড়ির ঘের রয়েছে সেসব থেকে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে যুক্তি হয় খুবই সামান্য। এর চেয়ে বরং পরিবেশ বিপর্যয়জনিত ক্ষতি হচ্ছে অনেক বেশি। আগে যেসব জমিতে ফসল উৎপাদন করা যেত, চিংড়ি চাষের ফলে লবণাক্ততার প্রভাবে এই জমিগুলো হারিয়েছে উর্বরাশক্তি। সেতু হওয়ার ফলে ঢাকা থেকে এ অঞ্চলে যাওয়ার সময় কমে আসবে অন্তত পক্ষে তিন ঘণ্টা। ফলে, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা খুলনা-যশোর অঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়নের সম্ভাবনা দেখছেন। এ অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে গড়ে উঠবে অনেক ইপিজেড। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিশ্বনন্দিত গন্তব্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার সমৃদ্ধ সুন্দরবন ও সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অভাবনীয় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে বিশাল পর্যটন শিল্প। শিল্পায়ন ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে আধুনিক নগরায়ন। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেলে ২০২১ সালের মধ্যেই এসব সম্ভাবনার গল্প বাস্তবে পরিণত হবে।
সরকারের যে একটি সুস্পষ্ট মহাপরিকল্পনা রয়েছে দক্ষিণবঙ্গ নিয়ে, সেটিও বেশ স্পষ্ট। ইতিমধ্যে খুলনায় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য অর্থ অনুমোদন করা হয়েছে একনেকের বৈঠকে। এর ফলে পদ্মা সেতু, যশোরের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর ও প্রস্তাবিত খুলনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মিলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাধারণের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে। শিল্পায়ন ও পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম যাতে মুখ থুবড়ে না পড়ে সে জন্য প্রয়োজন হবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। সেদিকটা বিবেচনায় রেখেই এগিয়ে চলছে ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি সই হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ২৪শ’ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল বা পর্যটনের প্রসারের কিছু পরই হয়তো এই বিদ্যুৎ পাবে দক্ষিণাঞ্চল। বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের।
প্রাসঙ্গিক আরও কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন। বর্তমান ঢাকা-মাওয়া সড়কটি দুই লেনের এবং দৈনিক মাত্র ৪ হাজার যানবাহন ধারণ করতে পারে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ২০২০ সাল নাগাদ এই রাস্তার ওপর যানবাহনের চাপ বেড়ে যাবে অন্তত চার গুণ। তাই, পদ্মার দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কের আগের রাস্তাগুলোকে সেভাবে চার লেন বা আট লেনে উন্নীত করতে হবে এখন থেকেই, যাতে পদ্মা সেতুর কাজ ও এই রাস্তাগুলোকে চার বা আট লেনে উন্নীত করার কাজ একই সময় শেষ হয়। এর সঙ্গে আরও লক্ষ্য করতে হবে, ঢাকার কেরানীগঞ্জের পর থেকে রয়েছে অনেক সরকারি-বেসরকারি আবাসিক প্রকল্প এলাকা। পদ্মা সেতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই আবাসন প্রকল্পগুলোতে ইমারত নির্মাণ হবে ব্যাপকভাবে। এর ফলে ঢাকা শহরের দুই প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে অনেক মানুষের। তাই এই ব্যাকওয়ার্ড লিংকও শক্তিশালী করতে হবে এখন থেকেই। হাতে সময় খুব বেশি নেই। কারণ, পদ্মা সেতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটবে এসব ঘটনা চোখের পলকে। তখন যেন মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয় তার জন্যই এ প্রসঙ্গের অবতারণা।
আমাদের বুঝতে হবে, একটি পদ্মা সেতু শুধু একটি প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে, এর সামনে-পেছনে আরও কিছু স্যাটেলাইট প্রকল্প নিতে হবে। সবকিছু সমন্বিতভাবে সুসম্পন্ন হলেই আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্ন পূরণের নতুন ঠিকানা হিসেবে পরিগণিত হবে।

অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)