এক দশকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ

দশ বছরের ব্যবধানে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পরিধি প্রায় দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে। ২০১৩ সালে শুমারিকালীন মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টিতে। যা ২০০১ এবং ২০০৩ সালে পরিচালিত শুমারিতে মাত্র ৩৭ লাখ ৮ হাজার ১৪৪টি। ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এক দশকের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪১ লাখ ১০ হাজার ৪২১টি। এছাড়া ১৯৮৬ সালে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৯২৬টি।

গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সদর দফতরে এক অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩-এর চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত রিপোর্টে এ সব তথ্য উঠে এসেছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্না, অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদুজ্জামান, পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনৈতিক শুমারির প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে আরও বেশি সহযোগিতা দেয়া দরকার। তাছাড়া হাওর অঞ্চলসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে আরও বেশি প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, প্রতিপদে পরিসংখ্যান বা তথ্য আমাদের কাজে লাগছে। আমার ভয় হচ্ছে আগামী ১০-১২ বছর আমরা মালয়েশিয়া বা ব্রাজিলের মতো জায়গায় যাব। তারপর আবার প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে কিনা। বাংলাদেশ গ্রাম ও শহরের পার্থক্য এখন নেই। খুব শীঘ্রই নাগরিক ও গ্রামীণ যেটুকু পার্থক্য আছে তা মুছে যাবে। আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে কাজ করার এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে টিম হিসেবে কাজ করা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ডায়নামিজম স্পষ্ট। দেশের অর্থনৈতিক শক্তি যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এটা পরিষ্কার। এবারে দেখা যাচ্ছে গ্রাম মানেই কৃষি কাজ নয়। এর মানে অন্য কিছু। গ্রামীণ খাতে উন্নয়ন হচ্ছে। কৃষি বহির্ভূত কাজ গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো শুধু কৃষিই নয়, মাল্টিপল কাজের সঙ্গে যুক্ত। এটা আগে ছিল না, এখন হচ্ছে। গ্রাম শহরের অর্থনৈতিক বিভাজন অনেক কমে গেছে আগামীতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হচ্ছে যে প্রবৃদ্ধি হবে তা সবাইকে নিয়েই হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বস্তির জায়গা হচ্ছে সক্ষমতা অর্জন। যা ছোট ছোট অর্থনীতিক ইউনিটের বিকাশের কারণে সম্ভব হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক ধাক্কার কারণেও অর্থনীতিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এ জন্য এসএমই সংজ্ঞা পরিবর্তন করে এ সব ছোট ইউনিটকে সহযোগিতা করা উচিত।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৭১ শতাংশ, ২০১৩ সালে তা হয়েছে ১১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। মোট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কুটিরশিল্পে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সকল শিল্পের মধ্যে কুটিরশিল্পের সংখ্যা ৬৮ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৪টি। এছাড়া ক্ষুদ্রশিল্প ৮ লাখ ৫৯ হাজার ৩১৮টি, মাইক্রো শিল্প ১ লাখ ৪০ হাজার ৭টি, মাঝারি শিল্প ৭ হাজার ১০৬টি এবং বৃহৎশিল্প ৫ হাজার ২৫০টি। প্রতিষ্ঠান ও কর্মরত জনবলের পরিমাণ বিবেচনায় ঢাকা বিভাগ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ বিভাগে ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩টি প্রতিষ্ঠানে ৯৩ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৮ জন জনবল রয়েছে। এর পরের অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগ। এই বিভাগে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৯টি প্রতিষ্ঠানে ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার ১১৫ জন জনবল রয়েছে। সব থেকে কম জনবল রয়েছে বরিশাল বিভাগে ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৫৫২ জন, যেখানে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১২৯টি।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। শহরের অর্থনীতির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। শুমারি ২০১৩ অনুযায়ী সামগ্রিক অকৃষিমূলক অর্থনীতির মধ্যে পল্লী এলাকার অবদান ছিল ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ। বর্তমানে এ হার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। শহরে মোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হচ্ছে, ২২ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩২টি, অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান দুই লাখ পাঁচ হাজার ৯১০টি। অন্যদিকে গ্রামে মোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫৯টি, অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান দুই লাখ ৭৬ হাজার ৯৯৩টি।

প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে নারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে মোট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নারী প্রধান প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬৮টি। ২০০৩ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৩ হাজার ৮৫৮টি। এক দশকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নারীদের সংখ্যা ৫ গুণেরও বেশি হয়েছে। অন্যদিকে এক দশকে কর্মসংখ্যান দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০১৩ সালে মোট ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জনবল বিভিন্ন অকৃষিমূলক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নিয়োজিত ছিলেন যার পরিমাণ ২০০৩ সালে ছিল মাত্র ১ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার ৪২২ জন। অর্থাৎ গত এক দশকে কর্মসংস্থান ১১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধির কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকশিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধিতে সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ শুমারির প্রাথমিক ফলাফল হতে দেখা গেছে সেবা খাতের কাযর্ক্রম যেমন মোটরগাড়ি এবং মোটরসাইকেল মেরামতসহ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ৯১ ভাগ স্থান দখল করে আছে। পরিবহন এবং মজুদ ১৬ দশমিক ৬৮ ভাগ, অপরপক্ষে উৎপাদন ১১ দশমিক এক ভাগ এবং অন্যান্য সেবা কাযর্ক্রম ১৬ দশমিক ২২ ভাগ স্থান দখল করে আছে।

এছাড়া খানাভিত্তিক (পরিবার) অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ২০১৩ সালে খানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে খানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫৭১টি, যা ২০০১ ও ২০০৩ সালে ছিল মাত্র তিন লাখ ৮১ হাজার ৫৫টি। অন্যদিকে ২০১৩ সালে শহরে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪৬ হাজার চারটি এবং গ্রামে পরিবারভিত্তিক আর্থিক ইউনিট হচ্ছে ২৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬৭টি।