মেইড ইন বাংলাদেশ

লেখক : মো. রহমত উল্লাহ শিক্ষার্থী পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের অর্থনীতিতে রয়েছে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বৈদেশিক সহায়তার উপর নির্ভরতা ও বিপুল আমদানি নির্ভরতা। একাত্তরের স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে অনেক বাধা বিপত্তি পার করে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি মোটামুটি স্থিতিশীল পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ মধ্যম পর্যায়ের একটি অর্থনীতির পিছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে পোশাক শিল্পের মতো বৃহত্ একটি খাত। যদিও বস্ত্র রপ্তানিতে কাগজে-কলমে বিশ্বে দুই নম্বর দেশ বাংলাদেশ কিন্তু অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এবং শুধু পোশাক খাতের উপর নির্ভরশীলতায় বাংলাদেশ যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম চার লাখ টাকা মূল্যমানের তৈরি পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে সারাবিশ্বের পোশাক রপ্তানিকারকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাংলাদেশকে। সস্তা শ্রম এবং সর্বোপরি নিম্ন উত্পাদন খরচের কারণে দিনে দিনেই পোশাকের অর্ডার সংখ্যার সাথে সমানুপাতিক হারে বেড়েছে পোশাক কারখানার সংখ্যা। পোশাকখাত বর্তমানে দেশের সর্ববৃহত্ রপ্তানিখাত হিসেবে ২০১০ সালে ৭৬ শতাংশ একক রপ্তানি আয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশি পোশাক কারখানাগুলো মূলত বিদেশি কোম্পানিগুলোর কন্ট্রাক্টর অথবা সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পোশাক উত্পাদনকারী এসব গার্মেন্টসগুলোর সারাবিশ্বে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। তবে এসব গার্মেন্টসের পণ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্রান্ড বা কোম্পানি রি-লেভেলিং করার পর বিদ্যমান থাকা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেভেলটি পুরো বাঙালি জাতির জন্য নিশ্চয়ই অনেক বড় গর্বের এবং প্রাপ্তির একটা ব্যাপার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশি এসব পণ্য এখন প্রায় পুরোটাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং এসব মানসম্পন্ন পোশাক  সারাবিশ্বে বাংলাদেশের নামকে দারুণভাবে মেলে ধরতে সক্ষম হয়। আর এ শিল্পের পেছনের ৪০ লাখ শ্রমিকের অবদান এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি; কিন্তু ছোট একটি দেশের অধিক জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এ শিল্পের নায়কেরা আজ অনেকাংশেই অনিরাপদ।

 

হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও তাদের মৌলিক অধিকারটুকু নিশ্চিত করার মতো সুযোগটুকু তারা আজকে পোশাক কারখানা থেকে পান কিনা তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। যদিও সস্তাশ্রমের ভিত্তিতে এ শিল্পের উত্পত্তি শ্রমের জন্য অধিক মূল্য পরিশোধ করতে হলে কারখানা মালিকদেরকেও আন্তর্জাতিক বায়ারদের কাছে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে এটাই সত্য। আর এ দামের উপর নির্ভর করবে একটি পোশাক অর্ডারকারী প্রতিষ্ঠান পোশাকের অর্ডারের জন্য কোন দেশের দিকে ঝুঁকবে। যার ফলে শ্রমমূল্য আর উত্পাদন খরচের সমন্বয় নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকবে এটা স্বাভাবিক; কিন্তু সমন্বয়কারী দালালদের হাতে পোশাক শ্রমিকের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে এটা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক। স্বাধীনতা-উত্তর ৪৪ বছর ধরেই অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদান ছিল ঈর্ষণীয়; কিন্তু আজ এত বছরেও সম্ভব হয়নি পোশাক শ্রমিকদের জন্য স্বতন্ত্র অথবা বিশেষায়িত একটি আইন তৈরি করা। নব্বইয়ের দশকে তৈরি হওয়া ‘শ্রম আইন পরিষদ’, ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন এবং সর্বশেষ শ্রম সংশোধন আইন বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য তৈরি আইন। এসব আইনের অনেক ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এসব আইন যতটা না শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর তার চেয়ে অধিক মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট। সর্বশেষ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে মহাজোট সরকারের অঙ্গীকার ছিল আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা করার।

 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে শক্ত অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে তার অনেকাংশেই অবদান রয়েছে পোশাক শ্রমিকদের রক্তকে পানি বানানো শ্রম। সস্তাশ্রমের নামে তাদেরকে ন্যূনতম বেঁচে থাকার মতো অধিকারটুকুও দেয়া হবে না- এটা নিতান্তই অমানবিক ও অসাংবিধানিক। এখনই সর্বোত্তম সময়, পোশাকখাতের অর্জিত মুনাফার যথাযথ বণ্টনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে পোশাক শ্রমিকদের মৌলিকতম অধিকারগুলোকে। আর তাহলেই তৈরি হতে থাকবে “মেইড ইন বাংলাদেশ” লেভেলটা নিয়ে আরো অন্তত কয়েক দশক ধরে গর্ব করার মতো উপলক্ষ।