স্বাস্থ্যসেবা ২০১৫ঃ সেরা হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল

স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থায়ন। ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সরবরাহ; স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা— সর্বোপরি নেতৃত্ব ও সুশাসনের ভিত্তিতে দেশের সরকারি হাসপাতালের একটি র্যাংকিং করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে সেবার মানে দেশের সেরা টারশিয়ারি (তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত) হাসপাতালের স্বীকৃতি পেয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই শ্রেণীতে দ্বিতীয় সেরা হাসপাতাল নির্বাচিত হয়েছে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ফরিদপুর, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি হাসপাতালগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এটি করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায়, যাতে সহায়তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ কার্যালয়।

ছয়টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিনটি পৃথক শ্রেণীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মোট ১৪৫টি হাসপাতাল তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টারশিয়ারি ১৫টি, জেলা পর্যায়ের ২৫টি ও উপজেলা পর্যায়ের ১০৫টি হাসপাতাল। জেলা পর্যায়ে সেরা পাঁচ হাসপাতালের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে কুষ্টিয়া, নরসিংদী, ঝিনাইদহ, গাজীপুর ও জয়পুরহাট সদর হাসপাতাল। উপজেলা পর্যায়ে সেবার মানে শীর্ষ পাঁচ হাসপাতাল হচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদী ও সাঁথিয়া, জয়পুরহাটের কালাই, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চায়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকারি হাসপাতালগুলোর র্যাংকিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হাসপাতালগুলোয় কর্মরতদের মধ্যে সাধারণ জনগণকে সেবা দেয়ার মনোভাব বাড়বে। অন্যান্য হাসপাতালের কর্মীরা এদের দেখে আরো ভালো করতে উৎসাহী হবেন।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও সরকারি হাসপাতালগুলোয় কীভাবে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করা যায়। এর অংশ হিসেবে গত বছর প্রথমবারের মতো শীর্ষ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হেলথ মিনিস্টার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। এবার সেরা হাসপাতাল ও ব্যবস্থাপকদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকাও করা হয়েছে।

তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনলাইন ডাটাবেজ সিস্টেমে নিয়মিত তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়। ভিত্তি মানের সঙ্গে হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কতটুকু মানোন্নয়ন হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতাল এ কার্যক্রমে অংশ নেয়। তবে অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেমে প্রদান করা তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা পর্যায়ের ১০৬, জেলা পর্যায়ের ২৫ ও টারশিয়ারি ১৫টি হাসপাতাল সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। পরবর্তীতে অনলাইনে দেয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য এসব হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদেরের নেতৃত্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি কার্যক্রমটি পরিচালনা করে।

পরিদর্শনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন বিভাগ, আইসিডিডিআর,বি, বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় ও বেসরকারি খাতের চিকিৎসকসহ ৪১ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে আটটি দল গঠন করা হয়।

হাসপাতালগুলোর মূল্যায়নে রাখা হয় মোট ৩০০ নম্বর। তিন ভাগে এ নম্বর বরাদ্দ ছিল। অনলাইনে নিয়মিত তথ্য প্রদানের জন্য ১০০, হাসপাতালের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শনে ১০০ ও রোগীর সন্তুষ্টি যাচাই জরিপে বাকি ১০০ নম্বর রাখা হয়। তবে চূড়ান্ত মূল্যায়নে পরিদর্শনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে অনলাইনে তথ্যের ক্ষেত্রে ২০, পরিদর্শনে ৬০ ও জরিপের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করা হয়।

চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর দেখা যায়, হাসপাতালগুলোর প্রাপ্ত ফল প্রায় কাছাকাছি। এজন্য প্রতিটি শ্রেণীর ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচ অথবা শীর্ষ ১০ হিসাবে তালিকা করা হয়েছে।

তালিকায় থাকা টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে ঢাকা বিভাগের তিনটি হাসপাতাল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি তালিকায় থাকা ঢাকা বিভাগের অন্য দুটি হাসপাতাল হচ্ছে ফরিদপুর মেডিকেল হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ শ্রেণীতে র্শীষ পাঁচের অন্য দুটি হাসপাতাল হলো রাজশাহী বিভাগের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ তালিকায় এসেছে হাসপাতালটি। হাসপাতালের সব কর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেবার মানের এ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এ স্বীকৃতি পেয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণি। তিনি বলেন, এ স্বীকৃতি আমাদের সবার। এ অর্জনের পেছনে হাসপাতালের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চিকিৎসক-নার্স ও কর্মচারী প্রত্যেকের অবদান রয়েছে।

জেলা পর্যায়ে সেবার মানে সেরা হাসপাতালগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়ার পরেই রয়েছে যথাক্রমে নরসিংদী, ঝিনাইদহ, গাজীপুর ও জয়পুরহাট সদর হাসপাতাল। ২৫টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে ঢাকা বিভাগের রয়েছে সাতটি, রাজশাহী বিভাগের চার, খুলনা বিভাগের চার, বরিশাল বিভাগের তিন, চট্টগ্রাম বিভাগের তিন, রংপুর বিভাগের তিন ও সিলেট বিভাগের একটি।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মান্নান বলেন, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, সেবাপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা, রোগীদের সন্তুষ্টি মূল্যায়ন করেই এ ফলাফল এসেছে। আগামীতেও আমরা সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।

উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ হাসপাতাল হিসেবে তালিকার প্রথম দুটি স্থানে রয়েছে পাবনার ঈশ্বরদী ও সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আনিসুর রহমান বলেন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার স্বীকৃতি এটি। আগামীতে আমাদের লক্ষ্য থাকবে আরো ভালো করার।