দৈর্ঘ্য বাড়ছে ৩৩ কিমি ব্যয় বৃদ্ধি সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা

রংপুর মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প

চার লেনে উন্নীত করা হবে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। এজন্য গত সেপ্টেম্বরে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৫৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীতের প্রকল্প হাতে নেয় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর। এখন হাটিকুমরুলের পরিবর্তে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন করা হবে। এতে প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য বাড়ছে ৩৩ কিলোমিটার। আর ব্যয় বাড়ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও বর্ধিত অংশটি চার লেন করতে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরেছিল সেতু কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। তবে আগের মতোই এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল অংশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও হাটিকুমরুল-রংপুর অংশ সওজ বাস্তবায়ন করবে।

সওজের তথ্যমতে, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার চার লেনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৭৪১ কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৬৭ কোটি টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের চেয়ে তা আড়াই গুণ বেশি।

এদিকে গত সেপ্টেম্বরে হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৫৭ কিলোমিটার চার লেন করতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। তখন কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন করার ক্ষেত্রে খুবই কম জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। এতে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় কম ছিল। তবে হাটিকুমরুল-রংপুর অংশে বেশকিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। মহাসড়কের পাশের জমির দামও অনেক বেড়ে গেছে। এতে নির্মাণ ব্যয় কিছুটা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। এছাড়া প্রকল্পটিতে সড়কের দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস লেন থাকবে। এটিও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ।

তবে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় বেশি হওয়ার যুক্তিটি সঠিক নয় বলে মনে করছে সেতু বিভাগসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর উভয় প্রান্তে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করা আছে। এজন্য অধিগ্রহণে বাড়তি কোনো ব্যয় হওয়ার কথা নয়। আর হাটিকুমরুল-রংপুর অংশেও জমি প্রয়োজন হবে ১৮৪ হেক্টর। এতে সর্বোচ্চ দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা।

উল্লেখ্য, এলেঙ্গা থেকে হাটিকুমরুল ও হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেনের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ঋণ চায় সেতু কর্তৃপক্ষ ও সওজ। তখন এডিবির শর্তে দুটি প্রকল্পকে একত্র করা হয়। একটি প্রকল্প নেয়া হলেও দুই প্যাকেজে ভাগ করেই দুই সংস্থা এটি বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পটির খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাটির কাজ, উপরিভাগ (পেভমেন্ট) নির্মাণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি ধরা হয়েছে। আর প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য সেতু-কালভার্টের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। ফলে ব্যয় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ নেই বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশটি নির্মাণ করা হয় ২০০৫ সালে। সে সময় কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। হাওরের ভেতর দিয়ে হওয়ায় সেখানে ৯ মিটার পুরু মাটির স্তর তৈরি করতে হয়। সে প্রকল্পেও ধীরগতির যানবাহনের জন্য এক পাশে পৃথক সার্ভিস রোড ছিল। সেটিই ছিল বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের উদাহরণ।

তিনি আরো বলেন, সাধারণত মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৫-৬ কোটি টাকার মতো। প্রকল্পের আওতায় ফ্লাইওভার বা ব্রিজ থাকলে ব্যয় কিছুটা বাড়বে। তবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৬৭ কোটি টাকা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা দেখলে এর বিস্তারিত কারণ বোঝা যাবে।

এদিকে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এশিয়ান হাইওয়ে, বিসমটেক ও সাসেক রোড করিডোরের আওতাভুক্ত হওয়ায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এক্ষেত্রে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সংস্থাটির কাছে ১০ হাজার ১৩২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ঋণসহায়তা চাওয়া হয়েছে। এডিবির বোর্ডসভায় অনুমোদন হলে ২০১৬ সালে এ ঋণ চুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। বাকি ২ হাজার ৬০৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহের কথা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, সাব-রিজিওনাল রোড কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে দেশের সব মহাসড়ক চার লেনে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের কাজ শুরু করা হয়েছে। এবার এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন করা হবে। এরই মধ্যে মহাসড়কটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন হয়েছে। আর এডিবিও প্রকল্পটিতে ঋণ দিতে মৌখিক সম্মতি দিয়েছে। আগামী বছর এ ঋণ পাওয়ার কথা। এর পরই কাজ শুরু করা হবে।

প্রসঙ্গত, রংপুর-এলেঙ্গা মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে ১ ও ২-এর রুটভুক্ত। আবার বিমসটেক রোড করিডোর ৩ এবং সাসেক হাইওয়ে করিডোর ৫-এর রুটভুক্তও এ মহাসড়ক। চার দেশের (বিবিআইএন) মোটরযান চলাচলে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত রুটগুলোর একটি এটি। অভ্যন্তরীণের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় রংপুর-এলেঙ্গা মহাসড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আগামী বছর কাজ শুরু করে ২০১৯ সালে প্রকল্পটি শেষ করার কথা।