মধ্যম আয়ের দেশ

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হলেও বাংলাদেশ এখনো রয়ে গেছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে ভাগ করে তিন ভাগে। স্বল্পোন্নত (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। সে হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথমোক্ত ক্যাটাগরিতেই

নিম্ন আয়ের তকমা ঘুচে চলতি বছর বিশ্বব্যাংকের ‘অ্যাটলাস মেথড’ নামে স্বীকৃত পদ্ধতিতে বাংলাদেশ উন্নীত হয়েছে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়। মূলত স্থানীয় মুদ্রা টাকায় মূল্যায়িত মোট জাতীয় আয়কে (জিএনআই) ডলারে রূপান্তরের মাধ্যমে এ স্বীকৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। নিঃসন্দেহে এটা দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন। এতে জাতি হিসেবে মর্যাদা বেড়েছে আমাদের। আলোচ্য স্বীকৃতির দুটো দিক আছে। এক. মনস্ত্বাত্তিক। মানসিকভাবে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির গতিসঞ্চারে ভূমিকা রাখবে। দুই. ব্র্যান্ডিং। এটা বিশ্বদরবারে আমাদের ভাবমূর্তি প্রোজ্জ্বল করবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন দেশ নিম্ন আয়ের আর কোন দেশ উচ্চ বা মধ্যম আয়ের, তা নির্ধারণ করে বিশ্বব্যাংক। মূলত কোন দেশগুলোকে কী ধরনের ঋণ দেবে, সেটা ঠিক করতেই তারা এ শ্রেণীবিন্যাস করে। সংস্থাটির পরিমাপ অনুযায়ী, ১ হাজার ৪৫ ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার পর্যন্ত মাথাপিছু জাতীয় আয় হলে একটি দেশ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় পদার্পণ করবে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ আয়ের মধ্যে পার্থক্য বড় হওয়ায় মধ্যম আয়কে আবার দুটি উপভাগে ভাগ করে সংস্থাটি। এই ভাগ অনুসারে, বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৮০ ডলার। বলা যায়, মধ্যম আয়ের সর্বনিম্ন সীমার সামান্য উপরে। সুতরাং ঝুঁকিও কম নয় বাংলাদেশের। ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে পিছলে পড়ার সমূহ শঙ্কা আছে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণই যথেষ্ট, যেমন— গৃহযুদ্ধ ও তেল খনি নিয়ে বিপত্তির কারণে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েও দক্ষিণ সুদান চলে গেছে নিম্ন আয়ের দেশে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংকটটিই দেশটির পিছিয়ে পড়ার কারণ। সেদিক থেকে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশেরও বেশ মিল আছে। দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে বটে, কিন্তু রয়ে গেছে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। সুতরাং এ অনিশ্চয়তা দূর না হলে ভবিষ্যতে আমাদের অর্থনীতির যাত্রাপথটি যে মসৃণ হবে, এমনটি আশা করা যায় না।

দেশ মধ্যম আয়ে উন্নীত হয়েছে মানে এই নয় যে, তাতে আর্থসামাজিক অবস্থার বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। এটা কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সূচক, সামগ্রিক উন্নয়নের নয়। বরং এতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও থাকছে। এখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া একটু কঠিন হতে পারে আমাদের। যদিও বিশ্বব্যাংক বলেছে, মধ্যম আয়ের তালিকায় প্রবেশ করলেও বাংলাদেশ সহজ শর্তের (আইডিএ) ঋণ পেতে থাকবে। যেমন— এখন ৩৯ বছরে পরিশোধযোগ্য ঋণ পায় বাংলাদেশ। পরিশোধের জন্য বাড়তি আরো ছয় বছর দেয়া হয়। আর সুদ দিতে হয় দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে। তবে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২০০ ডলার (বিশ্বব্যাংকের হিসাব) হলে সহজ শর্তে আর ঋণ পাবে না। তখন ঋণ নিতে হবে ৫ শতাংশেরও অধিক সুদে; উপরন্তু থাকবে না পরিশোধের দীর্ঘ সময়। ফলে আপাতত সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ার শঙ্কা না থাকলেও ভবিষ্যতে পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই আলোচ্য বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের সতর্ক থাকা চাই।

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হলেও বাংলাদেশ এখনো রয়ে গেছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে ভাগ করে তিন ভাগে। স্বল্পোন্নত (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। সে হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথমোক্ত ক্যাটাগরিতেই। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এলডিসি থেকে উত্তরণ। কেননা এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নাজুকতার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে কেবল আয় বেড়েছে; অন্য দুটি সূচকে দুর্বলতা বেশ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সুতরাং প্রত্যাশিত ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ায় তাতে আত্মতুষ্টির কিছুই নেই। কারণ কেবল আয় বৃদ্ধিকে উন্নয়ন বলা যায় না। আয় বাড়িয়েই মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ে আছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশসহ অনেক দেশ। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এমনকি চীন ও রাশিয়াও আটকে আছে মধ্যম আয়ের ফাঁদে। মূলত যারা কেবল আয় বাড়াতেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি; অবকাঠামো, শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামুখী থাকার দিকে নজর দেয়নি, তারাই আটকে আছে আলোচ্য ফাঁদে।

সন্দেহ নেই, প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় নির্ণায়ক আয় বৃদ্ধি। তবে এতে সমাজের সব স্তরের মানুষই উপকৃত হবে, তা বলা যাবে না। প্রবৃদ্ধির সুফল গড়িয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছাবে— এমন তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেছে ষাটের দশকেই। তখন অর্থনীতিবিদরা গবেষণা করে দেখান, অনেক দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এর সুফল দরিদ্র মানুষ পায়নি। বরং অনেক দেশে বেড়েছে বৈষম্য, কৃষি খাতে বৃদ্ধি পেয়েছে অপূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান এবং অবনতি ঘটেছে সাধারণ মানুষের জীবনমানেরও।

সত্তরের দশকেই অর্থনীতিবিদরা এটা মেনে নেন যে, কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি একটি দেশের উন্নয়নের যথাযথ নির্দেশক নয়। এর পরই উন্নয়ন তত্ত্বে গুরুত্ব পায় পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক সূচক বিষয়টি। ভবিষ্যত্ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আমাদেরও আলোচ্য বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। নিঃসন্দেহে বৈষম্য মোকাবেলায় ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন, প্রাগ্রসর আয়কর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়নে নজর দেয়া, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রের সঠিক বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করলে বর্তমান পর্যায় থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ আমাদের জন্য কঠিন হবে না।