স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যদি পদ্মা সেতুর জন্য আর্থিক অনুদান দেয়, তাহলে এটা বাস্তবায়ন করা কোনো ব্যাপারই নয়। এ দেশে কোটিপতি-ধনপতির অভাব নেই, দেশপ্রেমিক মানুষের সংখ্যাও কম নেই_ আপনি রাজধানী থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত আর্থিক সাপোর্ট সেল গঠন করুন এবং স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশ রাখুন। তাহলেই অর্থ সংগৃহীত হয়ে যাবে। আপনি বাংলাদেশের জন্য একটি শুভ সূচনা করেছেন, বাংলাদেশের মানুষকে আপনার এ শুভকাজে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিন।

ডিসেম্বর মাস বাঙালি জাতির জন্য আসলেই বিজয়ের মাস। ডিসেম্বর মাসেই বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ী হয়। আবার এ ডিসেম্বর মাসেই বাঙালির সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রকল্প_ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। বাঙালির মুক্তি এসেছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃসাহসী নেতৃত্বের ক্যারিশমায়। আর স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন সম্ভব হলো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মনোবল ও দূরদর্শিতায়। ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে পদ্মা সেতুর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিলেন_ বাংলাদেশ পারে, আসলেই বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন অবিশ্বাস্যই বটে। আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে মোট ৪২টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে যখন স্বপ্নের দ্বিতল পদ্মা সেতু ঝলমল করে উঠবে তখন শুধু বাঙালির নয়_ বিশ্ববাসীর চোখও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। এ ডিসেম্বর মাসেই বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক আহমদ লোক-বক্তৃতা ও সভা-সমাবেশে বাংলাদেশকে এশিয়ান টাইগার, অনেক দেশের জন্য অনুসরণীয়, অর্থনীতি উড়ন্ত সূচনার পর্যায়ে, প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হবে, অগ্রগতি সর্বত্রই ইত্যাদি কথা বলছেন।
পদ্মা সেতুর মহাকর্মযজ্ঞ উদ্বোধন মুহূর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মার দুই পাড়েই জনসমাবেশে বক্তব্য দেন। তার সে বক্তব্য যেমন আবেগমথিত ছিল, তেমন ছিল একজন দৃঢ়চেতা রাষ্ট্রনায়কের। আমরা সবাই কম-বেশি জানি যে, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধের ষড়যন্ত্রে দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত। মিথ্যা অজুহাতে বিশ্বব্যাংক আমাদের অর্থ দেয়নি, কিন্তু তাই বলে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকিনি। বাঙালি জাতি বীরের জাতি, এ জাতি কারো কাছে মাথা নত করে না। আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই এ সেতু নির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ কারো সাহায্য ছাড়াই পদ্মা বহুমুখী সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। আসলেই তাই বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে অসাধ্যকেও সাধন করতে পারে। আমরা বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলনে জয়ী হয়েছি, ছিষট্টি সালে ছয় দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তর ও সত্তর পেরিয়ে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি। এবার জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জয়ী হলাম পদ্মা সেতুর নির্মাণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।
এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য দেশব্যাপী জনতার উদ্দেশে আমি একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে উত্থাপন করতে চাই_ আমরা যখন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ছিলাম, তখন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। আজ আমরা ষোলো কোটি বাঙালি কি পারি না বত্রিশ হাজার কোটি টাকা নিজেরা দিয়ে পদ্মা সেতুকে জনতার সেতুতে রূপান্তরিত করতে? বাংলাদেশের সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষ যদি স্বেচ্ছায় তাদের এক দিনের পারিশ্রমিক সরকারকে দান করে, তাহলে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা মোটেই কোনো কঠিন কাজ হবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী মানুষের অভাব নেই। তারা হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে, ব্যাংক-বীমার মতো লাভজনক খাত থেকে মুনাফা নিচ্ছে। এরা যদি স্বেচ্ছায় সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে মোটেই আমাদের চিন্তার কিছু নেই। সেই সঙ্গে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, শিক্ষক, উকিল, বিচারক, শ্রমিক এমনকি রিকশাচালকসহ সব শ্রেণির মানুষ অর্থ দিয়ে সরকারকে সাহায্য করে, তাহলে এ সেতুর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা নতুন কোনো বড় প্রকল্পে ব্যয় করা যাবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে অসংখ্য সম্মানীয় পদক-পুরস্কার পেয়েছেন। নিশ্চয়ই দেশের মানুষ হিসেবে হাসিনা সরকারকে আমাদেরও কিছু উপঢৌকন দেয়া উচিত। আমরা ষোলো কোটি মানুষ যদি শেখ হাসিনাকে তথা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাকে ভালোবেসে ৩২ হাজার কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে উপহার দিই_ তাহলে কি খুব বেশি ক্ষতি হবে আমাদের? পদ্মা সেতুর জন্য শেখ হাসিনা সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এ জন্য তাদের অভিনন্দন জানাই। এবার জনগণই উদ্যোগী হয়ে জনগণের টাকায় পদ্মা ওরফে জনতার সেতু নির্মাণ করে দেখিয়ে দিক বাঙালি মাথা নত করে না, কখনো হারতে জানে না। এর মাধ্যমে বাঙালি জাতি আরেকটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করবে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্পের নাম পদ্মা বহুমুখী সেতু। প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোট ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এ সেতু দিয়ে ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদের ২১টি জেলার যানবাহন চলাচল করবে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল এ সেতু বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাইকার মতো প্রতিষ্ঠানের মুখে ঝামা ঘষা হবে। ওসব প্রতিষ্ঠান যা ভেবেছিল শেখ হাসিনার বাংলাদেশ যে তা নয়_ এটা প্রমাণ করতে পেরে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাই।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছিল, কিন্তু সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল তাদের কাঙ্ক্ষিত, রক্তাক্ত বিজয়। তদ্রূপ পদ্মা সেতু নির্মাণেও অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। প্রথম দিকে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য দিতে এগিয়ে আসে কিন্তু হঠাৎ করে ঘুষ গ্রহণের ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর জন্য এক টাকাও দেয়নি। অথচ তারা বলেছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘুষ গ্রহণের পাঁয়তারা চলছে। পরে অবশ্য উইকিলিকস ফাঁস করে মূল ঘটনা। বাংলাদেশে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি রয়েছেন, যার ইমেইল থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশকে অনুরোধ করে বলা হয় বাংলাদেশকে যেন সাহায্য না করা হয়। এরপর বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান বোর্ডের কোনোরূপ অনুমতি না নিয়েই অন্যায়ভাবে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ সেতু নির্মিত হলে চাঙ্গা হয়ে উঠবে দেশের অর্থনীতি। এ সেতুর চারপাশ ঘিরে যদি পর্যটন কেন্দ্র বানানো যায় তাহলে সেই খাত থেকেও যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।
পদ্মা সেতু নিয়ে বিএনপি-জামায়াতও কম জল ঘোলা করেনি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনার সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। জাপান সফরে গিয়ে সে দেশের সরকারকে তিনি পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণের অনুরোধ জানান। জাপান সরকার রাজিও হয়। মাওয়া পয়েন্ট দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য জাপানের উদ্যোগে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। এমনকি তারা মাওয়া থেকে পাটুরিয়ায় পদ্মা সেতু সরিয়ে ঘোর চক্রান্ত করে। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছু না করে তারা পুরো প্রকল্পটিই পরিত্যক্ত করে। আসলে সবাই সব কিছু পারে না। বিএনপি-জামায়াত জোটের কাজ হলো সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো। উন্নয়ন কখনই তাদের কাম্য ছিল না। দেশকে কিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি ধারায় পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, অকার্যকর করা যায়_ পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে তারা সেটাই করতে চেয়েছে। আজ তাই তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন সময় অবাস্তব দাবি উত্থাপন করছে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বলতে চাই, আপনার পাশে ষোলো কোটি বাঙালি আছে, আপনি সাহসিকতার সঙ্গে পদ্মা সেতুর কাজ করে যান। এ দেশের মানুষ টাকার জন্য স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন দেখবে না এমনটি হতেই পারে না। আমরা কারো সাহায্য চাই না। প্রতিটি বাঙালি যদি যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসে তাহলেই নির্মাণ হবে পদ্মা সেতু। আপনি শুধু নেতৃত্বের জায়গায় দৃঢ় হয়ে থাকুন বীর বাঙালি ঠিকই উপায় বের করে ফেলবে কিভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে।
বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যদি পদ্মা সেতুর জন্য আর্থিক অনুদান দেয়, তাহলে এটা বাস্তবায়ন করা কোনো ব্যাপারই নয়। এ দেশে কোটিপতি-ধনপতির অভাব নেই, দেশপ্রেমিক মানুষের সংখ্যাও কম নেই_ আপনি রাজধানী থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত আর্থিক সাপোর্ট সেল গঠন করুন এবং স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশ রাখুন। তাহলেই অর্থ সংগৃহীত হয়ে যাবে। আপনি বাংলাদেশের জন্য একটি শুভ সূচনা করেছেন, বাংলাদেশের মানুষকে আপনার এ শুভকাজে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিন।