সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা

বছরখানেকের মধ্যেই হঠাৎ করে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকা-, যা জঙ্গিবাদ নামে অধিক পরিচিত, বৃদ্ধির পথে। নতুন পদ্ধতি এবং ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা শুরু হয়েছে। তবে ইদানীং মাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয়, বাংলাদেশে ক্রমেই শাখা-প্রশাখা গজাচ্ছে এই অপশক্তির। ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পর থেকে সরকার অনেকটা ব্যাকফুটে গিয়ে এখন এ দেশে জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা শুধু একটি স্থানীয় গোষ্ঠী জেএমবির কর্মকা- বলে আখ্যা দিচ্ছে। অনুরূপভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যত জঙ্গি বলে সন্দেহবশত ধরপাকড় করছে তাদেরও জেএমবির সদস্য বলে তথ্য প্রকাশ করছে। মাত্র কয়েকদিন আগেই রাজধানীর একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা মিরপুরের একটি ফ্যাট বাড়িতে চৌদ্দ ঘণ্টা অপারেশন চালিয়ে প্রায় দশ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তথ্য মোতবেক এদের তিনজন জেএমবির সদস্য শনাক্ত করা হয়েছে, বাদবাকিদের পরিচয় জ্ঞাত করা হয়নি।
২০০৪-০৫ সালের দিকে বাংলাদেশে ‘জঙ্গি’ উত্থানের প্রক্রিয়া জেএমবি নামের সংগঠনের মাধ্যমে হয়েছিল। পরে প্রথমে তৎকালীন সরকার গুরুত্ব না দিলেও ৬৩ জেলায় একই সময়ে বোমা বিস্ফোরণের পর তৎকালীন সরকার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার এবং বিচারে ছয়জনকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ওই মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, এই শাস্তি হয়তো এই উত্থানকে খর্ব করবে অথবা নেতৃত্বের অভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। তেমনটি হয়নি। বরং নতুন নেতৃত্বে ও আঙ্গিকে পুনর্গঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে উত্থানের খবর পাওয়া যায় আরও বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর, যার মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম সর্বাগ্রে। এদের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এমনকি অভিজিৎ রায়সহ কয়েক ব্লগার হত্যার দায় স্বীকার করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বার্তাও দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তের অগ্রগতি সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানা যায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম অথবা হিজবুত তাহরীর দৃশ্যপট হতে নেপথ্যে চলে গিয়েছে। সামনে রয়েছে জেএমবি।
ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে এখন একটি জঙ্গিগোষ্ঠী সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। মনে হয় গোটা বাংলাদেশে এখন শুধু জেএমবির বিচরণ। এরই প্রেক্ষাপটে হালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি হামলার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। দুই বিদেশি হত্যার দায় এমনকি এখন পর্যন্ত অন্যান্য হামলার দায় জেএমবি তেমনভাবে স্বীকার না করলেও বিশ্বের আতঙ্ক আইএস বা দায়েশ দায়দায়িত্ব নিয়েছে। যদিও সরকার কোনোভাবেই আইএস সম্পৃক্ততা মানতে পারছে না। তবে দেশে জঙ্গি তৎপরতা যে ডালপালা ছড়িয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আইএসের মুখপাত্র ‘দাবিখ’ বাংলাদেশের জেএমবি নামের একমাত্র সংগঠনকে এক ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছে। আরও আহ্বান জানিয়েছে, বাংলাদেশের অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোকে জেএমবির সঙ্গে একীভূত হয়ে বৃহত্তর জেহাদের সঙ্গে একযোগে কর্মকা- পরিচালিত করতে। বাস্তবে এ ধরনের আহ্বান এবং আইএসের আদৌ অস্তিত্ব রয়েছে কিনা তা জানার মতো তথ্য-উপাত্ত সাধারণভাবে প্রাপ্ত নয়। তবে মাত্র কয়েকদিন আগে রাজশাহীর বাগমারার কাদিয়ানি মসজিদে হামলার ধরন এবং প্রথম ‘আত্মঘাতী হামলা’ বলে দাবি করে আইএসের ঘোষণা, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ইদানীং যে কয়েকটি হামলা হয়েছে, বিশেষ করে আশুরার প্রাক্কালে ইমামবাড়ায় হামলার পর থেকে যে কটিই হয়েছে তা বিভিন্ন মসজিদে। এর মধ্যে বগুড়ায় শিয়া মসজিদে, কান্তাজিউ মন্দিরের রাশমেলায়, খ্রিস্টান যাজকদের হত্যার হুমকি, চট্টগ্রামে নেভাল একাডেমির প্রাঙ্গণে মসজিদে হামলা এবং সর্বোপরি রাজশাহীর বাগমারায় কাদিয়ানি মসজিদে হামলা সবই এক ছকে বাঁধা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের অন্যতম নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে মসজিদে হামলা। এসব হামলার ধরন বিশ্লেষণে মনে হয়, এসব একই ছকে বাঁধা। প্রতি জঙ্গি হামলার তাৎপর্য আলাদা হলেও সার্বিকভাবে একক চিত্র ফুটে ওঠে।
দুটি মসজিদে হামলা হয়েছে, সেগুলো শিয়া এবং কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের। কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে কিছু সুন্নি সংগঠনের বিরোধ থাকলেও এ ধরনের আক্রমণ হয়নি। শিয়াদের ওপর তো কখনোই আক্রমণ হয়নি। এ দুটি আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম ধর্মের মধ্যে বিভাজনের সংঘাতের খ- রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে মনে হয়। সংখ্যালঘু ধর্মাম্বলম্বী সম্প্রদায়ের মধ্যে এ দেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যাজকদের ওপর হামলা এবং ভয় দেখানোর বিষয়টিও নতুন আঙ্গিকের আভাস দেয়। অপরদিকে ধর্মীয় মতামতের বিভাজনে না হলেও চট্টগ্রামে মসজিদের হামলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ হামলার মাধ্যমে জঙ্গিগোষ্ঠীর ক্ষমতার স্বাক্ষর দেওয়ার প্রয়াস বলেই মনে হয়। ওই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যে ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে তার আদিঅন্ত বিশ্লেষণে প্রতীয়মান যে, বহুদিন ধরেই ওই ব্যক্তির সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির যোগাযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলা বাইরে থেকে পরিচালিত হতে পারে। তবে বাংলাদেশে এখন এসব তৎপরতা যে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে তা এ ধরনের স্থাপনা ভেদ করে হামলা অনুপ্রবেশকারী ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই এসব ঘটনাই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে।
কাদয়ানি মসজিদে হামলার এ পর্যন্ত বিবরণে যা জানা গেছে তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, কোমরবন্ধনী বা বেল্টবোমা বহন করার একমাত্র উদ্দেশ্য আত্মঘাতী হামলা। তবে এ ক্ষেত্রে আত্মঘাতী হামলাকারী যথেষ্ট প্রশিক্ষিত বলে মনে হয় না। এ হামলায় উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো দিক শুধু একটি নয়, বরং দুটি। প্রথম আত্মঘাতী হামলা যদি হয়ে থাকে তবে হামলাকারী স্থানীয় বাসিন্দা হতে পারে না। হয়তো এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার পরিচয় নিয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি। অপরদিকে আইএসের দায় স্বীকার যা ‘ট্র্র্যাক’ (ঞৎধপ : ঞবৎৎড়ৎরংস জবংবধৎপয ্ অহধষুংরং ঈড়হংড়ৎঃরঁস) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা এবং বিশ্লেষক গোষ্ঠীর সংগঠন। এদের অন্যতম প্রধান স্থপতি ভারইয়ান খান (ঠবৎুধহ কযধহ) এবং বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা বিচাম গ্রুপ এলএলসি (ইবধপযধস এৎড়ঁঢ় খখঈ)। এদের কাছে পাঠানো বার্তায় আইএস যে দায় স্বীকার করেছে সেখানে বাগমারার এ মসজিদে হামলাকারীর নাম বলা হয়েছে আবুল ফিদা আল বাঙ্গালী। স্মরণযোগ্য যে, বাগমারা পশ্চিম বাংলা সীমান্তের বেশ সন্নিকটে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা তথ্যমতে পশ্চিম বাংলার সীমান্ত এলাকায় বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে জেএমবির উপস্থিতি ও ঘাঁটি রয়েছে বলে প্রতীয়মান। এসব বিষয় নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেও বেশ ঠা-া লড়াই চলেছিল। এ  ধরনের জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের পক্ষে সীমান্ত পারাপারে কঠিন বিষয় নয়। কাজেই নিহত বোমাবাজ যুবকের পরিচয় না পাওয়া গেলে আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাব্য ক্রিয়াকর্ম নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, এ লেখা শেষ করার প্রাক্কালে আরও উদ্বেগজনক যে খবর পরিবেশিত হয়েছে সেটি হলো চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার একটি ফ্যাট থেকে এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল ও সামরিক পোশাকের উদ্ধার। ধারণা করা হচ্ছে, এ গুলোর সঙ্গেও জঙ্গি সংগঠন জড়িত, যদিও কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। উল্লেখিত মডেলের রাইফেলটি যা পূর্বতন এসআর-২৫ এর নব্য সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশন কমান্ড (ঝঙঈঙগ) এবং বাংলাদেশসহ প্রায় ১১টি দেশের বিশেষ বাহিনী এ অস্ত্র ব্যবহার করছে। তথ্যে আরও প্রকাশ, ঝঙঈঙগ ২০১১ সাল থেকে একে-১১ রাইফেলের পরিবর্তে এসএসআর এসকে-২০ রাইফেল অন্তর্ভুক্ত করছে। এ অন্তর্ভুক্তি ২০১৭ সালে সম্পন্ন হবে। এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় মনে করা স্বাভাবিক যে, এ রাইফেল সহজলভ্য নয়। রাইফেলের সঙ্গে রয়েছে সামরিক বাহিনীর পোশাকসদৃশ ইউনিফরম। এসবই নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখার বিষয়। সরলীকরণ মঙ্গলময় হবে না।
আশার বিষয় যে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপর। তবে আগাম তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। ক্রমেই জঙ্গি তৎপরতার মাত্রায় বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। হতে পারে ছোট ছোট ঘটনা। এসব ঘটনা আরও বড় ঘটনার ইঙ্গিত বহন করে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জেএমবির সঙ্গে আইএসের আদৌ কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা তাও নিরিখের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র যে রয়েছে তা তাদের কর্মকা-ে প্রতীয়মান বলে মনে হয়। এখন যা প্রয়োজন তা হলো জাতীয় পর্যায়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।

Views: 9