বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বীকৃতি মিলছে বিশ্বব্যাপী

সম্প্রতি ২০১৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউএনডিপি। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সংস্থাটি নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতি বছর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। সুনির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে ১৮৮ দেশের মানব উন্নয়নে কোন দেশ তুলনামূলকভাবে কোথায়, সে অবস্থান তৈরি করে থাকে। এটি একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চমত্কার প্রতিফলন। এ প্রতিবেদনে মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিতে বিবেচিত দেশগুলোকে চারটি শ্রেণীতে বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন— ‘খুব উচ্চ মানব উন্নয়ন দেশ’, যে শ্রেণীতে রয়েছে ৪৯টি দেশ এবং এ শ্রেণীতে শীর্ষে নরওয়ে, দ্বিতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়া। তার পর ‘উচ্চ মানব উন্নয়ন দেশ’গুলোর শীর্ষে রয়েছে বেলারুশ। এ শ্রেণীতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু শ্রীলংকা। ‘মধ্যম মানবসম্পদ উন্নয়নের দেশ’গুলোর শীর্ষে (১০৬তম অবস্থান) আছে বতসোয়ানা। তৃতীয় এ শ্রেণী বিন্যাসে অর্থাত্ মধ্যম মানব উন্নয়ন দেশগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে— ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত ও বাংলাদেশ। সর্বশেষ ‘নিম্ন মানবসম্পদ উন্নয়ন’ শ্রেণীতে আছে কেনিয়া, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার প্রভৃতি। বিবেচিত এ মানবসম্পদ উন্নয়ন দেশগুলোয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, প্রবৃদ্ধির হার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। উপমহাদেশের দেশগুলোর দিকেই আমরা বেশি মনোযোগ দেব, যা বাংলাদেশের অবস্থান অনুধাবনে সহায়ক হবে। ২০১০-১৫ সময়ে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় শতকরা হার শ্রীলংকায় শূন্য দশমিক ৮, ভারত ১ দশমিক ২, বাংলাদেশ ১ দশমিক ২, নেপাল ১ দশমিক ২ এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীপ্রতি সন্তান জন্মহার, শ্রীলংকায় ২ দশমিক ৪, ইন্দোনেশিয়া ২ দশমিক ৪, ভারত ২ দশমিক ৫, বাংলাদেশ ২ দশমিক ২, নেপাল ২ দশমিক ৩ এবং পাকিস্তানে ৩ দশমিক ২। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশ সন্তোষজনকভাবে কমাতে পেরেছে, যা নারীপ্রতি কম সন্তান জন্মহারের কারণে ঘটেছে, যদিও বাংলাদেশ এখনো প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্বে এই ১৮৮ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সামষ্টিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় দরিদ্র জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে মাথাপিছু বার্ষিক আয় বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো দ্রুতগতিতে বাড়েনি, যদিও দেশজ প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ।

মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়। সরকারি ব্যয়ের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অর্জন আকর্ষণীয়। ২০১৩ সালে প্রতি এক হাজারে শ্রীলংকায় শিশুমৃত্যুর হার ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ২ ও ৯ দশমিক ৬ জন, সরকারি ব্যয় (জিডিপির অংশ) ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ায় শিশুমৃত্যু ও পাঁচ বছর বয়সের নিচে মৃত্যুহার যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৫, ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ভারতে শিশুমৃত্যু ও পাঁচ বছরের নিচে প্রতি হাজারে মৃত্যুহার যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৪ ও ৫২ দশমিক ৭ জন এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশ। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু ও পাঁচ বছরের নিচে মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৩ ও ৪১ জন এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। পাকিস্তানে এসব মৃত্যু যথাক্রমে ৬৯ ও ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ। শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য চমত্কার এবং ভারত, পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে, যদিও বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়ে অনেক কম। শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ২০১৩ সালে (ক্রয়ক্ষমতার সমতার মূল্যে) মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে— ৯ হাজার ৪২৬, ৫ হাজার ২৩৮, ৪ হাজার ৪৫৪ ও ২ হাজার ৮৫৩ মার্কিন ডলার। কম মাথাপিছু আয়ের তুলনায় সামাজিক খাতগুলোয় বাংলাদেশের সাফল্য ‘বিস্ময়কর’। প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষার বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৫-১৩ সময়ে প্রাপ্তবয়স্কদের গড় শিক্ষার হার ছিল ভারতে ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ, বাংলাদেশ ৫৮ দশমিক ৮, পাকিস্তান ৫৪ দশমিক ৭ ও নেপালে ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ। শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় ভারতে জিডিপির ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, পাকিস্তান ২ দশমিক ৫, বাংলাদেশ ২ দশমিক ২ ও নেপালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে কম খরচেও বাংলাদেশে শিক্ষার হারে অগ্রগতি লক্ষণীয়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু (২০১২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে) যথাক্রমে— ৬৬, ৬৬ ও ৭০ বছর (দক্ষিণ এশিয়ায় মানব উন্নয়ন, ২০১৫ প্রতিবেদন)।

২০০৫-১৩ সময়ে গড় প্রবৃদ্ধির হার শ্রীলংকায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ভারত ৩ দশমিক ৮ ও বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ এগিয়ে। বিবেচনার সময় ২০১০-১৫ হলে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হারও হতো সর্বাধিক। মোট জনসংখ্যার ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যার কর্মে নিয়োগের শতকরা হার (২০১৩ সালে) শ্রীলংকায় ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারত ৫২ দশমিক ২, পাকিস্তান ৫১ দশমিক ৬ ও বাংলাদেশে ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সীদের কর্মসংস্থানের হার বাংলাদেশে সর্বাধিক অর্থাত্ কর্মক্ষম জনসংখ্যার সর্বাধিক বাংলাদেশে কর্মে নিয়োজিত এখন। এ অধিক কর্মসংস্থান প্রমাণ করে বাংলাদেশে চলছে গতিশীল এক কর্মযজ্ঞ। জনসংখ্যার সক্রিয়তা ও কর্মচঞ্চলতা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে উন্নয়নের এক নতুন সোপানে। প্রবাসী শ্রমিক বিশ্বে আমাদের সংযুক্তি বাড়িয়েছে। দেশে প্রবাসী আয় দারিদ্র্য নিরসনকে দ্রুততর করেছে। উন্নত জীবনমান অর্জন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে গভীর। শ্রীলংকায় প্রবাসী আয় দেশজ আয়ের ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ভারতে মাত্র ৩ দশমিক ৭৩, পাকিস্তান ৬ দশমিক ৩ এবং বাংলাদেশে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। যদিও ভারত ও পাকিস্তান প্রবাসী শ্রমবাজারে ঢুকেছে বাংলাদেশের আগে।

কোন দেশের জনগণ কত সন্তুষ্ট— এ বিষয়ে ইউএনডিপি মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৫ সালের মতামত সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে:

সারণি-১: বিভিন্ন সূচকে জন মতামতের হার

বাংলাদেশের জনগণের জীবনমানে (Living Standard) সন্তুষ্টির কারণ সুস্পষ্ট। দ্রুত মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য কমে যাওয়া, খাদ্যপণ্যে নিম্ন মূল্যস্ফীতি, দ্রুত পরিবারের আকার ছোট হয়ে আসা, সর্ব পর্যায়ে শিক্ষার বিস্তৃতি, নারীর ক্ষমতায়ন অন্যতম কারণ। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে যারপরনাই সাধারণ জনগণ সন্তুষ্ট (৮১ শতাংশ)।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ উল্লম্ফন সময়ে জনমানসের উন্নয়নে সহায়ক মনোবিবর্তন বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো সুষম, অংশগ্রহণমূলক করে তুলবে। বাংলাদেশে জনমানসের সঙ্গে সরকারের নৈকট্য, আস্থাবোধ গণতন্ত্র বিকাশকেও সমৃদ্ধ করবে। জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে সরকারের প্রতি আস্থা প্রকাশিত হতো না (উপরের সারণি)। শ্রীলংকা, ভারত ও বাংলাদেশ এ তিন দেশেই সরকারের ওপর জনগণের আস্থা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক। প্রতিভাত হচ্ছে যে, গণতন্ত্রের শিকড় দেশ তিনটির জনগণের মনের গভীরে প্রোথিত।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন উদ্দীপনা। এর স্বীকৃতি মিলেছে বিশ্বব্যাপী। উপরের আন্তর্জাতিক সংস্থার উপস্থাপনাটি এ সত্যই তুলে ধরে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের বিশ্লেষণ, কৌশিক বসুর জোরালো সব মন্তব্য, প্রাইসওয়াটারহাউজ কুপার্সের ভবিষ্যদ্বাণী নতুন এক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘোষণাই দিয়ে চলেছে।