অগ্রসরতার পথে অবিচল বাংলাদেশ – বিভুরঞ্জন সরকার

এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং বিজয় দিবস পালিত হয়েছে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, যথেষ্ট উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রাক্কালে গত ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মূল পাইলিং ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন। যদিও এর মধ্যেই প্রকল্পের ২৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সেতু নির্মাণের ঘটনাটি এক বিরাট গৌরবের বিষয়। একাত্তরে যুদ্ধজয়ের পর আমরা যে আনন্দ লাভ করেছিলাম, পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘটনাটিও আমাদের প্রায় সেভাবেই আনন্দিত ও আলোড়িত করছে। কোটি কোটি বাঙালির স্বপ্নের এই সেতু নির্মাণ নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা চক্রান্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বানোয়াট অভিযোগ তুলে এর অর্থায়ন প্রত্যাহার করেছে। সেতু নির্মাণের কাজে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নিজের অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ কাজে হাত দিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ পারে। কী করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, সেটা বাঙালি জানে।

 

সম্প্রতি আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, একাত্তরে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব বাঙালি কুলাঙ্গার পাকিস্তানি দখলদারবাহিনীর সহযোগী হয়েছিল, মানবতাবিরোধী ভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেছিল, দেশকে মেধা ও নেতৃত্বশূন্য করার জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল, সেই ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের বিচার কাজ এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের বিচার কাজ চলছে। চারজনের বিচারের রায়ও কার্যকর হয়েছে। কয়েকদিন আগেই ফাঁসি হয়েছে একাত্তরের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের অন্যতম পরিকল্পনাকারী আল-বদর নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং মুসলিম লীগের কুখ্যাত পাণ্ডা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। এই দু’জনের বিচার হবে কিংবা বিচারের রায় কার্যকর হবে সেটা অনেকের কাছেই ছিল অভাবনীয়। একাত্তরের এই ঘাতকরা নানা সময় নানা  দম্ভোক্তি করেছে। একাত্তরে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে অবস্থা নিয়ে তারা যে ভুল করেছে। সেটা তারা স্বীকার করেনি। উল্টো ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেছে এদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই, ছিল না। তাদের কেউ কখনো বিচার করতে পারবে না বলেও বড়াই করেছিলেন।

 

একাত্তরের এই ঘাতকরা বিএনপির হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের, যে দেশের অভ্যুদয়ের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছিল এরা, রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, বিচারের মুখোমুখি করা এবং দণ্ড কার্যকর করা খুব সহজ কাজ ছিল না। বিচার বিলম্বিত করার জন্য, ভণ্ডুল করার জন্য দেশে এবং দেশের বাইরে তারা নানা অপ-তত্পরতা চালিয়েছে, ষড়যন্ত্র করেছে। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে কিন্তু বর্তমান সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত সাহসী ও অনমনীয় মনোভাবের  কারণে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রই হালে পানি পায়নি। এদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে। দেশের মানুষ এতে স্বস্তি বোধ করেছে। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার না হওয়ায় এতদিন যাদের মধ্যে চরম হতাশা ছিল, তারা এবার বিজয় দিবস উদযাপন করছেন নতুন আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে।

 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন সরকার একদিকে যেমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করছে, বছরের পর বছর ধরে জাতি যে লজ্জা ও গ্লানি বহন করছে, তা থেকে রেহাই দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাধীনতার স্বপ্ন সফল করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্পর্কে অত্যন্ত প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। তবে আশার পাশাপাশি হতাশার চিত্রও একেবারে দূর হয়ে যায়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্বপ্ন, এখনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এখনো নির্মূল হয়নি। বিদ্বেষ ও বিভেদের রাজনীতি দূর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একাত্তরের  মুক্তিযুদ্ধের সময়টা বাঙালির সবচেয়ে দুঃসময়, আবার সবচেয়ে ভালো সময়ও। একদিকে স্বজনহারানো, সম্পদ হারানোর বেদনা, অন্যদিকে স্বাধীনতা পাওয়ার উদ্দীপনা। পঁচিশে মার্চের রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হঠাত্ আক্রমণে বাঙালি জাতি সাময়িকভাবে হতবিহ্বল হলেও ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে ভুল করেনি। আর এভাবেই নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে বিজয় ছিনিয়ে এনে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির মনে নিঃসন্দেহে বড় ঝড় তুলেছিল, বাঙালির মনে সুদূরপ্রসারী আলো ফেলেছিল, কিন্তু সে আলোয় আমরা কতটুকু আলোকিত হতে পেরেছি সেটাই এখন আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে এসেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের যে বিষয়টি আমাদের বেশি আলোড়িত করে সেটা হলো মানুষের মধ্যে ঐক্য এবং সাহস। যেটা এর আগে বা পরে আর কখনো দেখা যায়নি। মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই তখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, লড়াই করেছিল, জীবন বাজি রেখেছিল। সত্যি তখন ছিল ‘এক নেতা, এক দেশ’। তখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মানুষকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর জীবনসংগ্রামই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। মানুষের মধ্যে একাত্তরে যে শক্তি ও সাহস দেখা গেছে তার কোনো তুলনা হয় না। তখন আমরা দেখেছি কি দুঃসাহস নিয়ে মানুষ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। অত্যাচার-নির্যাতন কোনো কিছুকেই তারা পরোয়া করেনি। সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং ভূমিকা ইতিহাসে সঠিকভাবে স্থান পেলে আজকের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারতো। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকেই অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া, খাবার দেয়া থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারা করেছেন। কেউ কেউ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছেন। সাধারণ মানুষের মনে এমন দৃঢ়তা কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করার এমন সাহস মানুষ কোত্থেকে পেয়েছিল— সে বিষয়টি কী আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?

 

আমরা সবাই জানি যে, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শত্রু-মিত্র ছিল। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই। অথচ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা শত্রু-মিত্রকে আলাদাভাবে বিচার করার চেষ্টা করিনি। শত্রুর বিরুদ্ধে এবং মিত্রর পক্ষে আমাদের যেভাবে অবস্থান নেয়া প্রয়োজন, সেটা আমরা প্রায়ই নেই না। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের বিরাট সাহায্য করেছে। প্রায় এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরাও অনেকে জীবন দিয়েছেন। কিন্তু সেজন্য এটা বলা যায় যে, ভারতে উস্কানিতেই সবকিছু হয়েছে। এ ধরনের সরল মন্তব্য ক্ষতিকর। আমাদের দেশের মানুষ নিজেরাই পরিবর্তনের দিকে এগিয়েছে। যে মানুষ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল সেই মানুষ আবার ১৯৪৮ সালে ভাষার জন্য লড়াই শুরু করেছে। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। এই দেশের মানুষই চুয়ান্নর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়েছে, ১৯৬২-তে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন করেছে। তারপর ৬ দফার মাধ্যমে স্বাধিকারের আন্দোলন শুরু হয়েছে, যে আন্দোলন ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানি সামরিক গোষ্ঠী নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ধারাবাহিক এই আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নিয়েছে। এর কোনো কিছুই তো ভারত এসে করে দেয়নি। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার জন্য ভারত-বিরোধিতা ছিল শাসকগোষ্ঠীর একটি বড় হাতিয়ার। কিন্তু অতি অপব্যবহারে এই হাতিয়ারও একাত্তরে ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল।

 

স্বাধীনতার জন্য আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিলাম, কারণ আমরা এমন একটি মুক্ত স্বদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য থাকবে না। ধর্ম বিশ্বাসের কারণে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করা হবে না। মানুষের ওপর চেপে বসবে না অগণতান্ত্রিক শাসন। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি থাকবে, নিরাপদে জীবন যাপন করবে সবাই। সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ থাকবে, সবাই পাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই, রোগে চিকিত্সা পাবে, বেকারত্ব দূর হবে, মানসম্মত জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত থাকবে না কেউ। এসব আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল স্বাধীনতার পর রচিত দেশের প্রথম সংবিধানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র— এই চার মূলনীতি গ্রহণের মধ্যদিয়ে।

 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশের মানুষের চেতনার জগতে গুণগত পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে সেই পরিবর্তন বাস্তবে অর্জিত হয়নি। জনগণের মধ্যে আদর্শবাদ ও সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশের কোনো উদ্যোগ স্বাধীনতার পর গ্রহণ করা হয়নি। ফলে জাতীয় জীবনে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে সমগ্র পরিস্থিতিই পাল্টে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পরিবর্তে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ ফিরিয়ে আনা হয়।

 

নয় মাসের মুক্তিসংগ্রামের কঠিন সময় অতিক্রম করলেও পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ সবার মধ্য থেকে একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসার না ঘটায় দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব থেকে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের জীবনে একটি কালবৈশাখী ঝড়ের মতো এলেও তা কোনো স্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের জন্য আসলে আমাদের সে রকম আগাম প্রস্তুতি ছিল না। দেশ স্বাধীন হলে আমরা কী করবো, কীভাবে চলবো সে বিষয়ে সবার মধ্যে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। মত ও পথের ভিন্নতাও ছিল। যার জন্য সুশৃঙ্খলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়নি। প্রবাসী সরকার গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেও বিভাজন ও অনৈক্য স্পষ্ট হয়েছিল। মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী আলাদা কমান্ডের অধীনে থাকায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিভাজন প্রক্রিয়া পথ পেয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যে যেমন ছিল প্রশাসন পরিচালনায় অনভিজ্ঞতা, পরিকল্পনাহীনতা, তেমনি ছিল প্রজ্ঞার অভাব। ক্ষমতার রাজনীতি দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিল। বঙ্গবন্ধুর অতিমানবিক উদারতা এবং সব বিষয়ে তার উপর অন্যদের নির্ভরতা সমস্যা তৈরি করছিল। এই সুযোগ গ্রহণ করেছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান নেতাদের হত্যা করে সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়। সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় তৈরি করা হয় সুবিধাবাদী চরিত্রের রাজনৈতিক দল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত করা হয়। সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমানকে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক’ আখ্যা দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সমান্তরালে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলতে থাকে। অথচ এই দু’জনের মধ্যে কোনো তুলনা চলে না।

 

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনির্বাচিত কিংবা নির্বাচিত অথচ গণবিরোধী সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদীদের উত্থান ঘটেছে, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলসহ নানা ঘাত-অভিঘাতের মধ্যদিয়ে সময় অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। নানা উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে পথ চলায় আশানুরূপ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়নি। জাতি পৌঁছাতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। ধনবৈষম্যসহ নানা ধরনের বৈষম্য বাড়ার কারণে সমাজে শান্তি ও স্বস্তি নষ্ট হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। ঊনিশ শ’ নব্বইয়ের পর থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন ঘটলেও দেশে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। আমরা ভুল করছি, ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি। রাজনীতি কলুষিত ও বৃত্তবন্দি হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করছে, জীবন দিচ্ছে, বিজয় অর্জনও করছে। কিন্তু অর্জিত বিজয় আবার ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়ে পড়ছি। এই অবস্থা চলতে পারে না। চলতে দেয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম পাকিস্তানি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে, এখন আবার আমাদের সে রকম ঐক্যবদ্ধ হতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। সব ধরনের অপ-রাজনীতির বিরুদ্ধে।

 

এবার বিজয় দিবস উদযাপন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র জাতি শপথ গ্রহণ করেছে— আমরা আর পিছু হটবো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্নাত হয়ে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, দারিদ্র্যমুক্ত, নিরক্ষরতামুক্ত, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত, আলোকিত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে আমরা অবিচল থাকবো।