হাতিরঝিলে বাস সার্ভিসে উচ্ছ্বসিত মানুষ

‘প্রতিদিন এইখানে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতাম। মাঝে মাঝে হেঁটেও যেতাম। আর অপেক্ষা করতেও হচ্ছে না, হাঁটতেও হচ্ছে না। আজ হাতিরঝিলের বাসে করেই যাব।’
রাজধানীর মধুবাগের বাসস্টপজের সামনে কথাগুলো বলছিলেন ঠিকাদার মাসুদ তালুকদার। গতকাল হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় কাঙ্ক্ষিত বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পর এভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ওই এলাকায় চলাচলকারী মানুষ।
হাতিরঝিলের এফডিসি ক্রসিংয়ের প্রবেশমুখে টিকিট কাউন্টার থেকে বাসে ওঠেন বিশ্বজিৎ। তিনি বলেন, ‘মিরপুর থেকে আসি। এরপর মাইক্রোবাসে উঠে রামপুরায় যেতাম। কিন্তু মাইক্রোবাসে দীর্ঘ লাইন থাকত। আজ এলাম আর উঠে পড়লাম। এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ।’
বসুন্ধরা মার্কেটে চাকরি করেন রাকিব। তিনি বলেন, মহানগর প্রজেক্ট এলাকা থেকে হেঁটে মধুবাগ মোড় পর্যন্ত এসেছি। মহানগর প্রবেশমুখে আরেকটি কাউন্টার করলে যাত্রী আরও বেশি হতো।
আশরাফুল আলম নামের এক যাত্রী বলেন, ‘এই বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় আমরা উচ্ছ্বসিত, আনন্দিত। সরকারকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
জানা গেছে, প্রাথমিক অবস্থায় ২৭ আসনের চারটি সাধারণ বাস নিয়ে এই সার্ভিস চালু হলো। এক মাসের মধ্যে আরও দুটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস এর সঙ্গে যোগ হবে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য প্রকল্প এলাকার ১০টি জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। টিকিট পাওয়া যাবে রামপুরা, মধুবাগ, এফডিসি মোড়, বউবাজার, শুটিং ক্লাব ও মেরুল বাড্ডার ছয়টি কাউন্টারে।
মধুবাগ কাউন্টারের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পালন করছেন সাদিয়া ইসলাম। তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী। সবাই হাসিমুখে টিকিট কিনছেন। কারও মুখে কোনো বিরক্তি নেই। যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’
এফডিসি ক্রসিং মোড়ে সৃজন দিও টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে হাজারেরও বেশি টিকিট বিক্রি করেছি। ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’
শেখ সুমন নামের বাসের একজন চালক বলেন, মানুষ বাসে উঠেই আনন্দ প্রকাশ করছে। চারটি বাসে হবে না। আরও চারটি বাস চালু করলে মানুষের ভোগান্তি কমবে।
জানা গেছে, বাসের ন্যূনতম ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। বাস ছাড়বে রামপুরা ব্রিজের গোড়া থেকে। সেখান থেকে মহানগর প্রজেক্ট ও মধুবাগ হয়ে এফডিসি ক্রসিং পর্যন্ত ভাড়া ১৫ টাকা। আবার এফডিসির ক্রসিং থেকে বেগুনবাড়ি, কুনিপাড়া, পুলিশ প্লাজা ও মেরুল বাড্ডা হয়ে রামপুরা পর্যন্ত একই ভাড়া কার্যকর হবে। যদি কোনো যাত্রী রামপুরা ব্রিজ থেকে বৃত্তাকার পথ ঘুরে আবার রামপুরায় যেতে চান, তাহলে তাঁকে ৩০ টাকা দিতে হবে। সকাল সাতটা থেকে বিরতিহীনভাবে রাত ১১টা পর্যন্ত এই বাস সার্ভিস চালু থাকবে।

বিপ্লব মাহাব নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘মাইক্রোবাসে ২৫ টাকা ভাড়া। বাসে ১৫ টাকা। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ, কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত সার্ভিসটি চালু করলে মানুষের আরও উপকার হতো।’ বাসের ভাড়া নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন সাইদুল ইসলাম। তিনি হাত উঁচিয়ে বলেন, ‘এইখান থেইক্যা এইখানে। ১০-১৫ টাকা ভাড়া। অন্যরা যানজটের দোহাই দিত। এখানে তো তা-ও নাই।’
বাস সার্ভিস চালুর প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতিরঝিল প্রকল্পের পরিচালক জামাল আক্তার ভূঁইয়া বলেন, ‘বাস সার্ভিসটির সবাই প্রশংসা করেছেন। অনেকে বলেছেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চারটি বাস চালু হলো, অবস্থার বিবেচনায় আরও বাস নামবে। কারণ এই টাকা দিয়ে হাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে জামাল তিনি বলেন, ‘হাতিরঝিলের রুট পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ প্রকল্পের বাইরের রুট আলাদা।’
হাতিরঝিল প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা। কিন্তু ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি প্রকল্পটি উদ্বোধনের পর প্রায় তিন বছর ধরে প্রকল্প এলাকার দুই পাশের ১৬ কিলোমিটার রাস্তায় কোনো বাস অথবা মিনি বাস চলাচলের অনুমতি ছিল না। এতে এই এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, বনশ্রী, রামপুরা, নিকেতন, মধুবাগ, মহানগর প্রজেক্ট, উলন ও মগবাজার এলাকায় বসবাসরতদের দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের। হাতিরঝিল প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে ৩০২ একর জমির ওপর। রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থাসহ বৃষ্টির পানি ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রাজধানীর একটি বড় অংশের জলাবদ্ধতা দূর করা, বৃষ্টি ও বন্যাজনিত পানি ধারণ, নগরের নান্দনিক সৌন্দর্য বাড়ানো ও সার্বিক পরিবেশের উন্নয়ন করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।